মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ৪৯৪
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
রাষ্ট্রনীতি-খিলাফত ও ইমারত

যে রূপ জানা গেল যে, ইসলাম মনুষ্য জীবনের সব শাখা-প্রশাখা পরিবেষ্টনকারী। ইহা আকাইদ, ঈমান, ইবাদত, আখলাক, সামাজিক শিষ্টাচার ও লেন-দেন-এর ন্যায় রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কেও তার অনুসারীদের পথ প্রদর্শন করে, নির্দেশ ও দিকদর্শন দেয়। বরং রাজ্য শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনা বিভাগ এর এক গুরুত্বপূর্ণ শাখা। কেননা, অন্যান্য বহু শাখার অস্তিত্ব এর সাথে সম্পৃক্ত ও গণ্ডিবদ্ধ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ স্বীয় কর্মপদ্ধতি ও বাণী দ্বারা এ শাখা সম্পর্কেও উম্মতকে পূর্ণ পথ প্রদর্শন করেছেন। হিজরতের পর মদীনা মুনাওরায় মুসলমানদের যখন একটি সামষ্টিক রূপ সৃষ্টি হল তখন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠিত হল। রাসুলুল্লাহ ﷺ নবী ও রাসূল হওয়ার সাথে উক্ত রাষ্ট্রের কর্ণধার এবং নির্বাহীও ছিলেন। হিজরতের পর প্রায় দশ বছর তিনি এ জগতে ছিলেন। এ সময়ে উক্ত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সীমা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছিল এবং দ্রুতই প্রশস্ততর হচ্ছিল। এমনকি তাঁর পবিত্র জীবনের শেষ পর্যায়ে গোটা আরব বরং ইয়ামান ও বাহরাইন অঞ্চলও উক্ত রাষ্ট্রের করতলগত হয়। উক্ত দশ বছরে সেই যুগের পরিমাপে সেই সব কাজ আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র হাতে সম্পন্ন করিয়ে ছিলেন, যা রাষ্ট্রীয় নেতাদেরই করতে হয়। তিনি আল্লাহর নাম বুলন্দ করা ও আল্লাহর বান্দাদের ওপর আল্লাহরই শাসন কায়িম করার জন্য এ পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টকারী বৈরী শক্তির সাথে যুদ্ধও করেছেন। এ উপলক্ষে সেনা দল ও সেনা অভিযান প্রেরণ করেছেন। সন্ধি করেছেন, জিযিয়া, খিরাজ ও যাকাতের আইন প্রবর্তন করেছেন। বিজিত অঞ্চলে কাযী, শাসক ও কালেক্টর নিয়োগ করেছেন। এবং এসব কাজ সম্পর্কে তিনি দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন।

তাঁর এই দশ বছরের শাসনকালে এবং এ বিষয়ে তাঁর দিক নির্দেশের মধ্যে ইসলামী রাষ্ট্র ও এর কর্ণধারদের জন্য নীতিগত পর্যায়ে পূর্ণ পথপ্রদর্শন রয়েছে। তাঁর পর তাঁর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষ আসহাব ও সাথীগণের মধ্যে যে চার ব্যক্তিত্ব একের পর এক সেই রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন পরিচালনার জন্য তাঁর স্থলাভীষিক্ত হন (হযরত আবু বকর সিদ্দীক, হযরত উমর ফারুক, হযরত উসমান যিন নূরাইন, হযরত আলী মুর্তাজা রা) তাঁরা নিজেদের যুগের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে যথাসম্ভব এই চেষ্টা করেন যে, রাষ্ট্র সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কর্ম-পদ্ধতি ও তার দিকনির্দেশনার পূর্ণ অনুসরণ ও অনুকরণ করা হবে। তাঁদেরই এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যে কারণে তাঁদেরকে 'খুলাফায়ে রাশিদীন' বলা হয়। 'খিলাফতে রাশিদা সেই রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রে তাঁর দিকনির্দেশনা ও তাঁর উত্তম আদর্শ যথাসম্ভব পরিপূর্ণ অনুসরণ করা হয়।

এ ভূমিকার পর রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কতক বাণী নিম্নে পাঠ করা যেতে পারে। এসব হাদীস থেকে এটাও জানা যাবে যে, ইসলামী রাষ্ট্র ও নেতাদের কী বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। এবং তাঁদের সাথে জনসাধারণের কিরূপ রীতি-নীতি থাকা চাই

জনসাধারণকে নেতার আনুগত্য এবং নেতাকে আল্লাহ্-ভীতি ও ন্যায়পরায়ণতার উপদেশ
৪৯৪. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহর আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্যতা করল সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল। যে নেতার আনুগত্য করল সে আমার আনুগত্য করল। আর যে নেতার অবাধ্যতা করল সে আমার অবাধ্যতা করল। আর ইমাম (ইসলামী রাষ্ট্রের কর্ণধার) ঢালস্বরূপ। যুদ্ধ করা যায় এর পেছনে থেকে এবং এর দ্বারা আত্মরক্ষা করা যায়। সুতরাং সে যদি আল্লাহ্-ভীতি ও পরহেযগারীর নির্দেশ দেয় এবং ন্যায় ও ইনসাফের রীতি গ্রহণ করে তবে এ জন্য তার রয়েছে বিরাট পুরস্কার। আর যদি সে এর বিপরীত কথা বলে তবে এর শাস্তি তার ওপর বর্তাবে। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَطَاعَنِي، فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ، وَمَنْ عَصَانِي، فَقَدْ عَصَى اللَّهَ، وَمَنْ يُطِعِ الأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي، وَمَنْ يَعْصِ الأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِي، وَإِنَّمَا الإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ، فَإِنْ أَمَرَ بِتَقْوَى اللَّهِ وَعَدَلَ، فَإِنَّ لَهُ بِذَلِكَ أَجْرًا وَإِنْ قَالَ بِغَيْرِهِ فَإِنَّ عَلَيْهِ مِنْهُ» (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ (যে রাসূলের আনুগত্য করল সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।) কেননা, আল্লাহর রাসূল যে নির্দেশ দেন তা আল্লাহ তা'আলারই পক্ষ হতে হয়ে থাকে। আর স্বয়ং আল্লাহ তা'আলারই নির্দেশ তাঁর আনুগত্য করা। এজন্য তাঁর নির্দেশ পালন করা আল্লাহ্ তা'আলার নির্দেশ পালন, আর তাঁর অবাধ্যতা আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা। এরপর যেহেতু আল্লাহরই নির্দেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপদেশ হচ্ছে এই যে, আমীরের আনুগত্য করা হবে এবং তাঁর নির্দেশ পালন করা হবে (শর্ত হচ্ছে শরীআতের পরিপন্থী হবে না) এমতাবস্থায় আমীরের আনুগত্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আনুগত্য হবে এবং তাঁর অবাধ্যতা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অবাধ্যতা হবে। উল্লেখ্য আরবী ভাষায় বিশেষ করে কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় 'আমীর' অর্থ শাসক।

একথা সুস্পষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ ﷺের এ বাণীর বিশেষ উদ্দেশ্য ও দাবি সৎকর্মে আমীর (যুগের শাসক)-এর আনুগত্যের গুরুত্ব বুঝানো যে, তার আনুগত্য ও অবাধ্যতা আল্লাহর রাসূলের এবং পরোক্ষভাবে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য ও অবাধ্যতা।

আগে বলা হয়েছে, আমীর ঢালস্বরূপ। ঢাল দ্বারা নিজের হিফাযত ও শত্রুর হামলা থেকে আত্মরক্ষা করা হয়। অনুরূপভাবে যুগের ইমাম (ইসলামী রাষ্ট্রের কর্ণধার) মুসলমান ও দীনের হিফাযতকারী ও পাহারাদার। এ হিফাযত ও প্রতিরক্ষা তাঁর বিশেষ দায়িত্ব। এ পরস্পরায় যুদ্ধ ও হত্যার উপলক্ষ আসবে। এ জন্য মুসলমানদের জন্য অত্যাবশ্যক হচ্ছে তারা তাঁর অনুগত ও বিশ্বস্ত হবে। তাঁর নির্দেশ পালন করবে। এছাড়া তিনি প্রতিরক্ষা ও হিফাযতের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন না।

পরিশেষে এই আমীর (রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ) দের উপদেশ প্রদান করা হয়েছে তারা অবশ্যই ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের অনুসরণ করবে। অর্থাৎ সর্বদা একথা তাঁদের দৃষ্টির সামনে থাকবে যে, আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আমাদের সর্বাবস্থা দেখছেন। কিয়ামতের দিন তার সামনে উপস্থিত হতে হবে, এবং আমীর ও শাসক হিসাবে আমি এখানে যা করেছি এর কঠিন হিসাব দিতে হবে। সুতরাং এর থেকে কখনো অমনোযোগী হবে না এবং ন্যায় ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার পূর্ণ চেষ্টা করবে। যদি এরূপ করে তবে আখিরাতে বিরাট পুরস্কার পাবে। আর যদি এর বিপরীত চলে তবে তার বিরাট শাস্তি ভোগ করতে হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান