মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ৪২২
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
ক্রেতা বিক্রেতার অনবহিতি থেকে অবৈধ ফায়দা লাভ এবং সর্ব প্রকার ধোঁকা ও প্রতারণা নিষিদ্ধ
৪২২. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, খাদ্য শস্য বহনকারী কাফেলার সাথে মাল ক্রয়ের জন্য পথে এগিয়ে মিলিত হয়ো না এবং তোমরা অপরের বেচা-কেনায় প্রবেশ করবে না, আর (কোন পণ্যের কৃত্রিম ক্রেতা সেজে এর) মূল্য বৃদ্ধির কাজ করবে না এবং শহরের ব্যবসায়ী গ্রাম্য লোকদের মাল নিজের কাছে রেখে বিক্রি করবে না। আর (বিক্রির জন্য উটনী কিংবা ছাগীর বাটে দুধ জমা করবে না। যদি কেউ এরূপ উটনী বা ছাগী ক্রয় করে, তবে এর দুধ দোহনের পর তার অধিকার রয়েছে। যদি পছন্দ হয়, তবে নিজের কাছে রাখবে আর যদি অপসন্দ হয় তবে ফেরত দেবে। আর (পশুর মালিককে) এক সা' (প্রায় চার সের) খেজুর দেবে। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «لاَ تَلَقَّوُا الرُّكْبَانَ، وَلاَ يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ، وَلاَ تَنَاجَشُوا، وَلاَ يَبِعْ حَاضِرٌ لِبَادٍ، وَلاَ تُصَرُّوا الْاِبِلَ وَالغَنَمَ، فَمَنِ ابْتَاعَهَا بَعْدَ ذَالِكَ فَهُوَ بِخَيْرِ النَّظَرَيْنِ بَعْدَ أَنْ يَحْتَلِبَهَا، إِنْ رَضِيَهَا أَمْسَكَهَا، وَإِنْ سَخِطَهَا رَدَّهَا وَصَاعًا مِنْ تَمْرٍ» (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীসে ব্যবসা ও ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত কতিপয় দিকনির্দেশ করা হয়েছে।
প্রথম দিকনির্দেশ তো তা-ই যা উপরের হাদীসে বলা হয়েছে যে, শস্য ইত্যাদি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বাইরে থেকে বহনকারী ব্যবসায়ী কাফেলার সাথে বাজার বা আড়তে পৌঁছার পূর্বেই পথে এগিয়ে তাদের মাল ক্রয় করা যাবে না। বরং যখন তারা বাজারে বা আড়তে মাল নিয়ে পৌঁছে তখন তাদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করা যাবে। এদিক নির্দেশনার হিকমত ও শুভ পরিণতির কথাও লিখা হয়েছে।

দ্বিতীয় দিক নির্দেশনার শব্দাবলী হচ্ছে এই ولا يبيع بعضكم على بيع بعض এর অর্থ, যদি কোন ক্রেতা দোকানদার থেকে জিনিস ক্রয়রত থাকে তখন অন্য দোকানদারের এ বিষয়ে প্রবেশ করা উচিত নয়। আর ক্রেতাকে একথা বলাও সংগত নয় যে, এ জিনিস তুমি আমার নিকট থেকে ক্রয় করে লও। এ কথা সুস্পষ্ট যে, এতে দোকানদারের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও অকল্যাণকামিতা সৃষ্টি হবে, যা অনিষ্ট ও ফাসাদের মূল।
তৃতীয় নির্দেশনার শব্দাবলীঃ ولا تناجشوا বাজার জগতে এরপও হয়ে থাকে যে, এক ব্যক্তি দোকানদার থেকে কোন জিনিস ক্রয়ের কথা-বার্তা বলছে, তখন অন্য এক ব্যক্তি একই জিনিসের কৃত্রিম ক্রেতা সেজে এসে জিনিসটির বেশি মূল্য হাঁকে যেন প্রকৃত ক্রেতা বেশি মূল্য দিতে উদ্বুদ্ধ হয়। স্পষ্টত ইহা ক্রেতার সাথে এক প্রকার প্রতারণা। ولا تناجشوا বলে এটাই নিষেধ করা হয়েছে।

চতুর্থ দিকনির্দেশনা এইঃ لا يبيع حاضر لباد এর অর্থ হচ্ছে শহরের ব্যবসায়ীগণের উচিত গ্রামের লোক যে জিনিস ও খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি বিক্রয়ের জন্য নিয়ে আসে, তাদের মাল এ উদ্দেশ্যে নিজের নিকট রাখবে না যে, যখন মূল্য চড়া হবে তখন বিক্রয় করবে। বরং গ্রামের লোক যখনই মাল নিয়ে আসে তখনই তা বিক্রি হওয়া চাই। এ পদ্ধতিতে এসব দ্রব্যের কমতি হবে না, জনসাধারণের জন্য মূল্য বৃদ্ধি পাবে না ও মালের অভাব পড়বে না। পক্ষান্তরে গ্রাম থেকে মাল বহনকারীগণ যখন দিনে দিনে হাতে হাতে নিজের মালের মূল্য পেয়ে যাবে তখন সত্বরই তারা বাজারে অন্য মাল নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। এভাবে তাদের ব্যবসা বেড়ে উঠবে আর মুনাফাও বেশি হবে।

পঞ্চম ও শেষ দিকনির্দেশ হচ্ছেঃ لا تصروا الإبل والغنم -এর অর্থ হচ্ছে কেউ যেন এরূপ না করে যে, যখন তার দুধ প্রদানকারী পশু (উটনী, ছাগী ইত্যাদি) বিক্রির প্রয়োজন পড়ে তখন এক দু'বেলা পূর্বে এর দুধ দোহন ছেড়ে দেয়, যেন ক্রেতা এর স্ফীত বাঁট দেখে মনে করে যে, পশুটি খুবই দুধ প্রদানকারী এবং যেন বেশি মূল্যে ক্রয় করে নেয়। স্পষ্টত ইহা এক প্রকারের প্রতারণা, সামনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে। যদি কেউ এরূপ পশু ক্রয় করে তবে তার অধিকার রয়েছে যে, নিজ ঘরে দোহনের পর যদি পশুটি অপসন্দ হয় তবে পশুটি ফেরত দেবে। আর যদি পসন্দ করে তবে নিজের নিকট রেখে দেবে। আর ফেরত প্রদানের অবস্থায় এক সা' (প্রায় ৪ সের) খেজুরও পশুর মালিককে দেবে। এই হাদীসের সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় শব্দাবলীতে بالخيار ثلاثة أيام রয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে, এরূপ পশু ক্রয়কারীর তিন দিন পর্যন্ত পশুটি ফেরত প্রদানের অধিকার রয়েছে। (এরপর ফেরত প্রদানের অধিকার থাকবে না) বস্তুত মুসলিমের এই বর্ণনায় صاعا من تمر এর পরিবর্তে صاعا من طعام لا سمراء এ শব্দাবলী রয়েছে। এ ভিত্তিতে এক সা' খেজুরের স্থলে গম ছাড়াও এক সা অন্য শস্য (যব ইত্যাদি) দেওয়া বৈধ হবে।

পশু ফেরত প্রদানের অবস্থায় এর মালিককে এক সা' খেজুর ইত্যাদি এক, দুই, বা তিন দিন (যতক্ষণ পশুকে নিজের কাছে রেখেছে)-এর দুধ দোহন করেছে ও পান করেছে। সাথে সাথে পশুকে পানাহার করাতে খরচও করেছে। এভাবে হিসাব যেন সমান হয়ে গিয়েছে। তদুপরী যে ক্ষতি রয়ে গেল এবং ফেরত প্রদানে পশুর মালিককে যেরূপ মন ভেঙ্গেছে তার ক্ষতি পূরণ করতে অথবা লাঘব করার জন্য এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (আল্লাহ-ই ভাল জানেন)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান