মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ৩০৯
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
সতর ও পর্দার ব্যাপারে নির্দেশাবলী

মানুষের সামাজিক জীবনে সতর ও পর্দার বিষয়টিরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আর এটা ঐসব বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর মধ্যে মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বিশ্ব স্রষ্টা মহান আল্লাহ্ তা'আলা অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে লজ্জা-শরমের ঐ উপাদান রাখেননি, যা মানুষের স্বভাবে রাখা হয়েছে। এ জন্য অন্যান্য প্রাণী আপন দেহের কোন অঙ্গকে এবং নিজের কোন কাজকে গোপন রাখার চেষ্টা করে না, যা মানুষ করে থাকে এবং সে নিজের স্বভাবের কারণে এটা করতে বাধ্য।

বস্তুত সতর ও পর্দা নীতিগত পর্যায়ে মনুষ্য স্বভাবের চাহিদা। এজন্যই সকল জাতি গোষ্ঠী নিজেদের আকীদা, দৃষ্টিভঙ্গি, প্রথা ও অভ্যাসের বহু মতবিরোধ সত্ত্বেও মৌলিকভাবে এ বিষয়ে একমত যে, মানুষ অন্যান্য পশুর ন্যায় নগ্ন-উলঙ্গ থাকতে পারে না।

অনুরূপভাবে একথাও সকল মানবগোষ্ঠীর নিকট স্বীকৃত; বরং প্রতিষ্ঠিত যে, এ ব্যাপারে নারীদের স্তর পুরুষদের চেয়েও উর্ধ্বে। এ বিষয়টি যেন এমন যে, যেভাবে সতর ও পর্দার ব্যাপারে সাধারণ প্রাণীদের তুলনায় মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তেমনিভাবে এ ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বৈশিষ্ট্য ও অগ্রাধিকার রয়েছে। কেননা, নারীদের দৈহিক গঠন এমন যে, এতে যৌন আকর্ষণ- যা অনেক ফিতনার হেতু হতে পারে, এটা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশী। এ জন্যই তাদের সৃষ্টিকর্তা তাদের মধ্যে লজ্জার অনুভূতিও পুরুষদের চেয়ে বেশী রেখেছেন। বস্তুতঃ আদম-সন্তানের জন্য সতর ও পর্দা মৌলিকভাবে তাদের প্রকৃতিগত চাহিদা এবং সারা মনুষ্য জগত কর্তৃক স্বীকৃত বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত। তারপর যেভাবে মানব জীবনের সকল শাখার দিকনির্দেশনার পূর্ণতা আল্লাহ তা'আলার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) এর মাধ্যমে এসেছে, তেমনিভাবে এ শাখায়ও যে দিকনির্দেশনা তিনি দিয়েছেন, এটা নিঃসন্দেহে এ শাখার পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত রূপ।

এ অধ্যায়ের নীতিগত ও মৌলিক নির্দেশাবলী তো তাঁর আনীত হেদায়াত গ্রন্থ কুরআন মজীদেই দেওয়া হয়েছে। সূরা আ'রাফের শুরুতেই যেখানে হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি ও মনুষ্য পৃথিবীর সূচনার উল্লেখ রয়েছে, সেখানে বলা হয়েছেঃ "আদম সন্তানদেরকে সতর ঢেকে রাখার নির্দেশ ঐ প্রাথমিক যুগেই দেওয়া হয়েছিল এবং সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল যে, এ ব্যাপারে তোমরা শয়তানের বিভ্রান্তি প্রয়াসের শিকার হয়ে যেয়ো না। সে তোমাদেরকে মানবতার উঁচু স্তর থেকে ফেলে দিয়ে পশুদের ন্যায় উলঙ্গ ও বেপর্দা করার চেষ্টা করবে।"
এরপর সূরা নূর ও সূরা আহযাবে বিশেষভাবে মহিলাদের পর্দার ব্যাপারে বিধি-বিধান দেওয়া হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে, মহিলাদের প্রকৃত স্থান তাদের নিজেদের ঘর, তাই বিনা প্রয়োজনে তারা ভ্রমণ ও বেড়ানো অথবা প্রদর্শনীর জন্য ঘরের বাইরে যাবে না। আর যদি প্রয়োজনে বের হতে হয়, (যার অনুমতি রয়েছে।) তাহলে পূর্ণ পর্দার পোশাক গায়ে দিয়ে বের হবে। আর ঘরের ভিতরেও স্বামী ছাড়া ঘরের অন্যান্য লোক অথবা যাতায়াতকারী আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ লোকদের সামনে পোশাক ও পর্দার ব্যাপারে এসব নির্ধারিত সীমারেখা পালন করে চলবে। পুরুষদেরও উচিত যে, নিজের আত্মীয়-স্বজন অথবা সংশ্লিষ্ট লোকদের ঘরে অবগতি ও অনুমতি ছাড়া হঠাৎ প্রবেশ করবে না। তাছাড়া পুরুষরা নারীদেরকে এবং নারীরা পুরুষদেরকে দেখার ও তাদের প্রতি তাকাবার চেষ্টা করবে না; বরং সামনে পড়ে গেলে দৃষ্টি নীচু করে নিবে।

আল্লাহ্ তা'আলা যাদেরকে সুস্থ জ্ঞান দিয়েছেন এবং তাদের স্বভাব বিকৃত হয়ে যায়নি, তারা যদি চিন্তা করে, তাহলে তাদের সন্দেহ থাকবে না যে, এসব বিধান মানুষের লজ্জানুভূতির চাহিদাসমূহকেও পূর্ণতা দান করে এবং এগুলো দ্বারা শয়তানী ও কাম সম্পর্কীয় ফিতনার দরজাও বন্ধ হয়ে যায়- যা জীবনকে কলুষিত ও চরিত্রকে বিনষ্ট করে দেয় এবং কখনো কখনো বিরাট লজ্জাজনক ও ঘৃণ্য পরিণতির কারণ হয়ে যায়।

এ ভূমিকার পর এরই আলোকে এ অধ্যায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিম্ন বর্ণিত হাদীসসমূহ পাঠ করে নিন।

জরুরী সতর
৩০৯. হযরত জারহাদ ইবনে খুওয়াইলিদ রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন: তুমি কি জান না যে, রানও সতরের অন্তর্ভুক্ত। (অর্থাৎ, এটা উদাম করা জায়েয নেই।) তিরমিযী, আবু দাউদ
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ جَرْهَدٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ الْفَخِذَ عَوْرَةٌ؟» (رواه الترمذى وابوداؤد)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

মানুষের দেহের যে অংশগুলোকে সাধারণ পরিভাষায় লজ্জাস্থান বলা হয়, এগুলোর ব্যাপারে তো প্রত্যেক ব্যক্তি-এমনকি যারা আল্লাহ্ এবং কোন ধর্মকেও স্বীকার করে না- তারাও এটা বুঝে যে, এগুলো ঢেকে রাখা জরুরী। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ বাণী দ্বারা জানা গেল যে, মনুষ্য দেহে কেবল লজ্জাস্থান ও এর নিকটবর্তী অংশই নয়; বরং রান (উরু) পর্যন্ত সতরের অন্তর্ভুক্ত, যা ঢেকে রাখা জরুরী। সতর সম্পর্কে এটা যেন পরিপূরক শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা।

এ হাদীসে فخذ (রান) কে عورة বলা হয়েছে। عورة এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ঢেকে রাখার জিনিস- যা প্রকাশ করা লজ্জা ও শরমের পরিপন্থী।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান