মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ১৪৬
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
সাক্ষাত অথবা ঘরে কিংবা মজলিসে আসার জন্য অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন
১৪৬. হযরত সা'দ ইবনে উবাদা রাযি.-এর পুত্র কায়েস ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের বাড়ীতে তশরীফ আনলেন এবং (রীতি অনুযায়ী বাইরে থেকে) বললেন: আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। আমার পিতা খুবই ক্ষীণ স্বরে কেবল সালামের উত্তর দিলেন (যাতে তাঁর কানে আওয়াজ না পৌঁছে।) আমি তখন বললাম, আপনি কেন তাঁকে ভিতরে আসার অনুমতি দিচ্ছেন না? আমার পিতা বললেন, আরে রাখ, কিছু বলো না- যাতে তিনি আমাদেরকে বেশী করে সালাম দিতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবার বললেন: আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহ-মাতুল্লাহ। হযরত সা'দ আবারও খুব আস্তে সালামের উত্তর দিলেন, (যা তিনি শুনতে পাননি।) তারপর আবার বললেন, আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। (এবার যখন তিনি কোন উত্তর শুনতে পেলেন না, তখন) তিনি ফিরে যেতে উদ্যত হলেন। এবার সা'দ তাঁর পেছনে ছুটলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার সালাম শুনছিলাম এবং (ইচ্ছা করেই) চুপে চুপে উত্তর দিচ্ছিলাম- যাতে আপনি আমাদেরকে আরও সালাম দেন (আর আমরা এর বরকত লাভ করে নেই।) একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সাথে তার বাড়ীতে আসলেন। হযরত সা'দ বাড়ীর লোকদেরকে তাঁর জন্য গোসলের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলেন এবং তিনি গোসল করে নিলেন। তারপর সা'দ তাকে একটি চাদর দিলেন- যা জাফরান অথবা ওয়ার্স দ্বারা রঞ্জিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এটা 'এশতেমাল' পদ্ধতিতে অর্থাৎ, শরীরে পেচিয়ে পরিধান করলেন। তারপর দু'হাত তুলে এভাবে দু‘আ করলেন: اللَّهُمَّ اجْعَلْ صَلوتك ورحمتك على ال سعد অর্থাৎ, হে আল্লাহ্! তুমি তোমার বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত নাযিল কর সা'দ পরিবারের উপর। তারপর তিনি কিছু খাবার গ্রহণ করলেন। এরপর যখন তিনি যাওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন আমার পিতা সা'দ একটি গাধা পেশ করলেন- যার উপর কাপড়ের গদি লাগানো ছিল। আমার পিতা সা'দ বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে যাও। তখন আমি তাঁর সাথে রওয়ানা হলাম। এবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন, তুমিও আমার সাথে সওয়ারীতে উঠে যাও; কিন্তু আমি অস্বীকার করলাম। তিনি তখন বললেন, হয় আমার সাথে সওয়ারীতে আরোহণ কর, না হয় ফিরে যাও। (অর্থাৎ, এটা আমি মানতে পারি না যে, আমি সওয়ারীতে আরোহণ করে যাব, আর তুমি পায়ে হেটে সাথে যাবে।) কায়স ইবনে সা'দ বলেন, তখন আমি ফিরে আসলাম। -আবূ দাউদ
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ قَيْسِ بْنِ سَعْدٍ، قَالَ: زَارَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي مَنْزِلِنَا فَقَالَ: «السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ» فَرَدَّ اَبِىْ رَدًّا خَفِيًّا، قَالَ قَيْسٌ: فَقُلْتُ: أَلَا تَأْذَنُ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: ذَرْهُ يُكْثِرُ عَلَيْنَا السَّلَامِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ» فَرَدَّ سَعْدُ رَدًّا خَفِيًّا، ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ» ثُمَّ رَجَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاتَّبَعَهُ سَعْدٌ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي كُنْتُ أَسْمَعُ تَسْلِيمَكَ وَأَرُدُّ عَلَيْكَ رَدًّا خَفِيًّا لِتُكْثِرَ عَلَيْنَا مِنَ السَّلَامِ، فَانْصَرَفَ مَعَهُ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَمَرَ لَهُ سَعْدٌ بِغُسْلٍ، فَاغْتَسَلَ، ثُمَّ نَاوَلَهُ مِلْحَفَةً مَصْبُوغَةً بِزَعْفَرَانٍ، أَوْ وَرْسٍ، فَاشْتَمَلَ بِهَا، ثُمَّ رَفَعَ يَدَيْهِ وَهُوَ يَقُولُ: «اللَّهُمَّ اجْعَلْ صَلَوَاتِكَ وَرَحْمَتَكَ عَلَى آلِ سَعْدِ» قَالَ: ثُمَّ أَصَابَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الطَّعَامِ، فَلَمَّا أَرَادَ الِانْصِرَافَ قَرَّبَ لَهُ سَعْدٌ حِمَارًا قَدْ وَطَّأَ عَلَيْهِ بِقَطِيفَةٍ، فَقَالَ لِي سَعْدٌ: اصْحَبْ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَصَحِبْتُهُ فَقَالَ لِىْ «ارْكَبْ مَعِىْ» فَأَبَيْتُ، فَقَالَ: إِمَّا أَنْ تَرْكَبَ وَإِمَّا أَنْ تَنْصَرِفَ فَانْصَرَفْتُ. (رواه ابوداؤد)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, কেউ যখন কারো সাথে সাক্ষাতের জন্য যাবে, তখন প্রথমে 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে ভিতরে আসার অনুমতি চাইবে। আর যখন কোন উত্তর পাওয়া না যাবে, তখন দ্বিতীয়বার এবং এবারও উত্তর না পাওয়া গেলে তৃতীয় বার 'আসসালামু আলাইকুম' বলে অনুমতি প্রার্থনা করবে। ঘটনাক্রমে তৃতীয়বারও যদি উত্তর না পাওয়া যায়, তাহলে ফিরে যাবে।

হযরত সা'দ ইবনে উবাদা রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর বারবার সালাম ও এর বরকত লাভ করার জন্য যে ভূমিকা গ্রহণ করেন (যার কারণে হুযুর (ﷺ)কে তিনবার সালাম দিতে হয় এবং অবশেষে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করতে হয়।) বাহ্যত এটা একটা অসমীচীন কাজ বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু তার নিয়্যত ও আবেগ খুবই মুবারক ছিল এবং হুযুর (ﷺ)-এর স্বভাব ও মেযাজ জানা থাকা এবং তাঁদের মধ্যকার সুসম্পর্কের কারণে তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এতে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন না। এ জন্য তিনি এমনটি করেন। বাস্তবেও তাই হল এবং হুযুর (ﷺ) কোন বিরক্তি প্রকাশ করলেন না; বরং তার আবেগ ও নিয়্যতের উপযুক্ত মূল্যায়ন করলেন-যেমনটি তাঁর দু‘আর দ্বারা প্রকাশ পেয়েছে।

এ হাদীসে একথাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, হুযুর (ﷺ) গোসল করার পর এমন একটি চাদর গায়ে জড়িয়ে নিলেন- যা জাফরান অথবা ওয়ার্স দ্বারা রঞ্জিত ছিল। অথচ অন্য কোন কোন হাদীসে এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে যে, কোন পুরুষ জাফরান অথবা ওয়ার্স দ্বারা রঞ্জিত কাপড় পরিধান করবে। (ওয়ার্স ও জাফরানের মতই এক জাতীয় উদ্ভিদ- যার মধ্যে রঙও থাকে, সুগন্ধিও থাকে।) তাই এখানে হয়ত এটা মেনে নিতে হবে যে, এ ঘটনাটি-যা ব্যাখ্যাধীন হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে, ইসলামের ঐ প্রাথমিক যুগের যখন জাফরান ইত্যাদি দ্বারা রঞ্জিত কাপড় ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞাই আসে নাই। আর একথাও বলা যেতে পারে যে, হুযুর (ﷺ) যে চাদর ব্যবহার করেছিলেন, এটা পূর্বে কখনো রঞ্জিত করা হয়েছিল, কিন্তু পরে ভালোভাবে ধুয়ে বিবর্ণ করে নেওয়া হয়েছিল। আর বিবর্ণ করে নেওয়ার পর এর ব্যবহার পুরুষদের জন্যও জায়েয।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ১৪৬ | মুসলিম বাংলা