মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ৭২
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি যত্নবান হওয়াও প্রতিবেশীর একটি হক

প্রতিবেশীদের হক ও অধিকারের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যেসব বাণী এ পর্যন্ত লিখা হয়েছে, এগুলোর অধিকাংশের সম্পর্ক জীবনের লেন-দেন তাদের সাথে সম্মান, খাতিরের ব্যবহার ও উত্তম আচরণ সম্পর্কিত ছিল। পরিশেষে হুযুর (ﷺ)-এর ঐ বাণীটিও পাঠ করুন, যেখানে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, যদি কারো আশেপাশে এমন লোক বসবাস করে, যারা দ্বীনি শিক্ষা-দীক্ষা, আমল ও চারিত্রিক দিক দিয়ে পশ্চাদপদ, তাহলে অন্যদের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও সংশোধনের চিন্তা ও চেষ্টা করা। যদি তারা এতে ত্রুটি ও অবহেলা করে, তাহলে অপরাধী ও শাস্তির যোগ্য হবে।
৭২. আলকামা ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আবযা তার পিতা আব্দুর রহমান সূত্রে তদীয় পিতা আবযা খুজায়ী রাযি. থেকে বর্ণনা করেন যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর এক বিশেষ ভাষণে বললেন: ঐসব লোকের কি হয়ে গেল যে, তারা তাদের প্রতিবেশীদেরকে দ্বীনের জ্ঞান ও ইলম দান করার চেষ্টা করে না, তাদেরকে ওয়ায-নসীহতও করে না এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করে না। আর ঐসব (ইলমহীন ও পশ্চাদপদ) লোকদের কি হল যে, তারা নিজেদের প্রতিবেশীদের নিকট থেকে দ্বীনের জ্ঞান ও ইলম আহরণের চেষ্টা করে না এবং তাদের উপদেশ গ্রহণ করে না। আল্লাহর কসম! (দ্বীনের জ্ঞান ও ইলমধারীদের) কর্তব্য এই যে, তারা নিজেদের (অজ্ঞ ও পশ্চাদপদ) প্রতিবেশীদেরকে দ্বীনের জান ও ইলম দানের চেষ্টা করবে, তাদেরকে ওয়ায-নসীহতের মাধ্যমে সংশোধন করার প্রয়াস চালাবে এবং নেক কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করবে। অনুরূপভাবে পশ্চাদপদ প্রতিবেশীদের কর্তব্য হচ্ছে যে, তারা নিজেরা উৎসাহী হয়ে প্রতিবেশীদের নিকট থেকে দ্বীনের জান ও ইলম অর্জন করবে এবং তাদের উপদেশ গ্রহণ করবে। অন্যথায় (অর্থাৎ, এ উভয় শ্রেণী যদি নিজেদের কর্তব্য পালন না করে,) তাহলে আমি দুনিয়াতেই তাদের শাস্তি ত্বরান্বিত করাব। -ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ, বুখারীর ওহদান, ইবনুস সাকান
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبْزَى عَنْ أَبِيهِ عَنْ جده: قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا بَالُ أَقْوَامٍ لا يفقهون جيرانهم ولا يعلمونهم ولا يعظونهم ولا يامرونهم ومَا بَالُ أَقْوَامٍ لا يتعلمون جيرانهم ولا يتفقهون ولا يتعظون والله ليعلمن قوم جيرانهم ويفقهونهم ويعظونهم ويامرونهم وينهونهم وليتعلمن قوم من جيرانهم ويتفقهون ويتعظون ولاعاجلنهم بالعقوبة فى الدنيا. (رواه ابن راهويه والبخارى فى الوحدان وابن السكن وابن مدة)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসটি কানযুল উম্মালে ৫ম খণ্ডে প্রতিবেশীর অধিকার শিরোনামে ঠিক এভাবেই উল্লেখিত রয়েছে, যেভাবে এখানে লিখা হয়েছে। কিন্তু অন্য এক স্থানে ঐ কানযুল উন্মালেই হুযুর (ﷺ)-এর এ বক্তব্যটি প্রায় অনুরূপ শব্দমালায় এ অতিরিক্ত সংযোজনসহ উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইঙ্গিত এই বক্তব্যে আবু মুসা আশআরী ও আবু মালেক আশআরীর সম্প্রদায়ের প্রতি ছিল। ঐ সম্প্রদায়ের লোকেরা সাধারণভাবে দ্বীনি জ্ঞান ও ইলমে সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু তাদেরই এলাকায় ও তাদেরই প্রতিবেশীদের মধ্যে এমন লোকও বসবাস করত, যারা এ দিক দিয়ে খুবই পশ্চাদপদ ছিল। তাদের শিক্ষা-দীক্ষার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও এর প্রতি কোন আগ্রহ ও চিন্তা ছিল না। এ দিক দিয়ে এ দু'টি শ্রেণীই ত্রুটিকারী ছিল। এ ভিত্তিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপন স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তাদের নাম উল্লেখ না করে নিজের বক্তব্যে এ উভয় শ্রেণীকে ভর্ৎসনা করেছেন। ঐ বর্ণনায় সামনে গিয়ে একথাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন আশআরী গোত্রের লোকেরা জানতে পারল যে, এ বক্তব্যে হুযুর (ﷺ)-এর ইঙ্গিত আমাদের প্রতি ছিল, তখন তাদের একটি প্রতিনিধি দল হুযুর (ﷺ)-এর খেদমতে হাজির হয়ে এ প্রতিশ্রুতি দিল যে, ইন্‌শাআল্লাহ্ আমরা এক বছরের মধ্যে এ অঞ্চলের লোকদেরকে দ্বীনি শিক্ষা দান করব।

এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রতি অঞ্চলের ইলমধারীদেরকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন যে, তারা নিজেদের জ্ঞানহীন প্রতিবেশীদেরকে দ্বীনের ইলম শিক্ষা দিবে এবং তাবলীগ ও ওয়ায নসীহতের দ্বারা তাদের সংশোধনের চেষ্টা করে যাবে। অনুরূপভাবে জ্ঞানহীন ও শিক্ষাবঞ্চিত লোকদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন যে, তারা নিজেদের আশেপাশের আলেম ওলামা ও দ্বীনদার লোকদের পথে দ্বীনি শিক্ষা-দীক্ষা ও আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে যোগাযোগ ও সম্পর্ক রেখে চলবে।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ দিকনির্দেশনার উপর যদি আমল অব্যাহত থাকত, তাহলে উম্মতের কোন শ্রেণীর মধ্যেই দ্বীন থেকে চেতনাহীনতা এবং আল্লাহ্ ও রাসূলের সাথে ঐ সম্পর্কহীনতা পরিলক্ষিত হত না, যার মধ্যে উম্মতের অধিকাংশ আজ নিমজ্জিত।

নিঃসন্দেহে এ সময়ের সবচেয়ে বড় সংস্কারমূলক কাজ এটাই যে, উম্মতের মধ্যে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের এ অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হবে, যার প্রতি এ হাদীসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খুবই ভাগ্যবান হবে ঐসব বান্দা যারা এর তাওফীক লাভ করবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান