মা'আরিফুল হাদীস
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
হাদীস নং: ২৯২
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
দরূদ ও সালাম
সালাত ও সালাম তথা দরূদ শরীফ এক প্রকার সর্বোত্তম ও সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন দু'আ, যা আল্লাহ পাকের দরবারে গিয়ে থাকে এবং যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্তার সাথে ঈমানী সম্পর্ক এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার অভিব্যক্তিস্বরূপ তাঁর জন্যে করা হয়ে থাকে। এর আদেশ স্বয়ং আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে পাক কুরআনে ঘোষিত হয়েছে:
{ إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا } [الأحزاب: 56]
এ আয়াতে ঈমানদারদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, তারা যেন আল্লাহর রাসূলের প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করে। (আর এটাই হচ্ছে আয়াতের আসল প্রতিপাদ্য।) এ সম্বোধন ও আদেশের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা এবং এতে জোর দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভূমিকা স্বরূপ বলা হয়েছেঃ
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ
অর্থাৎ নবীর প্রতি সালাত (যার নির্দেশ তোমাদেরকে দেওয়া হচ্ছে) আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর পবিত্র ফিরিশতাকুলের আচরিত অভ্যাস, তোমরাও একে তোমাদের অভ্যাসে পরিণত করে এই প্রিয় ও মুবারক আমলে শরীক হয়ে যাও!
আদেশে দান ও সম্বোধনের এ ভঙ্গিটি কুরআনে পাকে কেবল মাত্র সালাত ও সালামের ক্ষেত্রেই অবলম্বন করা হয়েছে। অন্য কোন আমলের ব্যাপারেই এরূপ বলা হয়নি যে, স্বয়ং আল্লাহ এবং তাঁর ফিরিশতাগণ এরূপ করে থাকেন, সুতরাং তোমরাও এমনটি করবে। নিঃসন্দেহে এটা সালাত ও সালামের অনন্য বৈশিষ্ট্য-এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মকামে-মহবুবিয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্যও বটে।
নবীর প্রতি সালাতের মর্ম এবং একটি সন্দেহ নিরসন
সূরা আহযাবের উক্ত আয়াতের দ্বারা অনেকের মনে একটা খটকা লেগে যায় যে, উক্ত আয়াতে আল্লাহ ও ফিরিশতাদের বেলায়ও সালাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
আবার মু'মিন বান্দাদের বেলায়ও ঐ একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ হাকীকতের দিক থেকে আল্লাহ ফিরিশতাকুল এবং মু'মিন বান্দাদের আমল নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকবে।
আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি যে 'সালাত'-যাকে এ আয়াতে ফিরিশতাদের সাথেও সম্পৃক্ত করে يُصَلُّوْنَ (তাঁরা সকলে সালাত প্রেরণ করেন) বলা হয়েছে এবং সকলের আমলকেই এক শব্দে 'সালাত' বলা হয়েছে, তা তো কোনক্রমেই মু'মিনদেরও আমল হতে পারে না। অনুরূপ, ঈমানদার বান্দাদেরকে صَلُّو বলে যে 'সালাত'-এর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা' কখনো স্বয়ং আল্লাহর কাজ হতে পারে না।
এ সন্দেহ ভঞ্জনের উদ্দেশ্যে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, সালাত শব্দটিকে যখন যার দিকে সম্পৃক্ত বা সম্বোধিত করা হয়, তখন তার হিসাবে তার অর্থ হয়ে থাকে। যখন আল্লাহর দিকে এ শব্দটিকে সম্পৃক্ত করা হয়, তখন তার অর্থ হয় রহমত বর্ষণ করা, আর যখন ফিরিশতাকুল এবং মু'মিনদের সাথে তা সম্পৃক্ত হয়। তখন তার অর্থ হয় আল্লাহর দরবারে রহমত বর্ষণের দু'আ করা। কিন্তু বিশুদ্ধতর কথা হলো, সালাত শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। সম্মানিত করা, প্রশংসা করা, মর্যাদা সমুন্নত করা। প্রীতি বাৎসল্য, বরকত-রহমত, স্নেহ- সোহাগ করা, সদিচ্ছা, নেক দু'আ বা আশীর্বাদ করা এ সব অর্থেই সালাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এজন্যে তা আল্লাহ, ফিরিশতাকুল এবং মু'মিন বান্দাদের সকলের পক্ষ থেকেই সমভাবে হতে পারে। অবশ্য, এটুকু পার্থক্য থাকবে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে 'সালাত' তাঁর উচ্চ শান অনুযায়ীই হবে। ফিরিশতাগণের 'সালাত' হবে তাঁদের মর্যাদা অনুপাতে এবং মু'মিন বান্দাদের সালাত হতে তাঁদের নিজেদের মর্যাদা অনুপাতে।
সে হিসাবে এ আয়াতের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর প্রতি অত্যন্ত সদয় ও প্রসন্ন, তাঁর আদর-সোহাগ অহরহ তাঁর প্রতি বর্ষিত হচ্ছে। তিনি তাঁর প্রশংসায় মুখর এবং উচ্চ থেকে উচ্চতর মর্যাদায় তিনি তাঁকে আসীন করতে যত্নবান। ফিরিশতাগণও তাঁকে অত্যন্ত সম্মান-সমীহ করে থাকেন। তাঁর প্রশংসা ও স্তব-স্তুতিতে তাঁরাও পঞ্চমুখ। সতত তাঁরা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আয়রত। সুতরাং হে মু'মিন বান্দারা! তোমরাও অনুরূপ কর! সর্বদা আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাঁর জন্যে স্নেহ-বাৎসল্য, মর্যাদাবৃদ্ধি, মকামে মাহমূদে আসীন করা এবং গোটা বিশ্বের ইমামত, তাঁর সীমাহীন কবুলিয়াত এবং শাফা'আতের দু'আ করে তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ কর!
সালাত ও সালামের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব
এ আয়াতে যে শানদার ভূমিকা দিয়ে যে গুরুত্ব সহকারে ঈমানদারগণকে সালাত ও সালামের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা থেকেই এর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য এবং আল্লাহর কাছে তা অত্যন্ত প্রিয় আমল হওয়াটা সুস্পষ্ট। পরবর্তী হাদীসগুলো দ্বারা জানা যাবে যে, ঈমানদার বান্দাদের জন্যে তাতে কতটুকু খায়র-বরকত ও রহমত নিহিত রয়েছে।
সালাত ও সালাম সম্পর্কে ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণের বিভিন্ন মসলক
গোটা মুসলিম জাতির ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ প্রায় ঐকমত্য পোষণ করেন যে, সূরা আহযাবের উক্ত আয়াতের নির্দেশ অনুসারে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয। ইমাম শাফেয়ী এবং এক রিওয়ায়াত অনুসারে ইমাম আহমদও বলেন, প্রত্যেক সালাতের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরূদ পাঠ ওয়াজিব। তা না করলে সালাত আদায় হবে না। কিন্তু ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানীফা এবং অধিকাংশ ফকীহগণের অভিমত হলো, শেষ বৈঠক তো নিঃসন্দেহে ওয়াজিব, যাতে প্রাসঙ্গিকভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর দরূদ-সালামও এসে যায়। কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে দরূদ শরীফ পাঠ ফরয বা ওয়াজিব নয়, বরং তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতপূর্ণ সুন্নত-যা ছুটে গেলে সালাতে অনেক কমতি ও অপূর্ণতা রয়ে যায়। কিন্তু এ মতদ্বৈততা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে প্রায় সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন যে, উক্ত আয়াতের নির্দেশ অনুসারে প্রতিটি মুসলমানের উপর ব্যক্তিগতভাবে সালাত ও সালাম প্রেরণ ফরযে আইন, যেমনটি তাঁর রিসালাতের সত্যতার সাক্ষ্যদান ওয়াজিব-যার জন্যে কোন নির্দিষ্ট সময় বা সংখ্যার বাধ্যবাধকতা নেই। এর সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে অন্তত জীবনে একবার তা করতে হবে এবং তার উপর কায়েম থাকতে হবে।
পরবর্তীতে হাদীস আসছে-যদ্বারা জানা যাবে যে, যখনই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নাম বা প্রসঙ্গ আসবে তখনই অতি অবশ্য তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করতে হবে। এ ব্যাপারে অবহেলাকারীর প্রতি কঠোর সতর্কবাণীর কথাও বর্ণিত হবে। এসব হাদীসের ভিত্তিতে অনেক ফকীহর অভিমত হচ্ছে, যখনই কেউ হুযুর পাক ﷺ-এর উল্লেখ করবেন বা অন্য কারো মুখে তাঁর নাম শুনবেন তখন তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ ওয়াজিব। একটি অভিমত হলো একই মজলিসে যদি বারবার তাঁর নাম উচ্চারিত হয় বা তাঁর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়, তখন প্রতিবারই তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ ওয়াজিব হবে। অন্য এক অভিমত হচ্ছে, প্রথমবার দরূদ পাঠ ওয়াজিব এবং পরবর্তী প্রতিবার দরূদ পাঠ মুস্তাহাব। মুহাক্কিক আলিমগণ এ অভিমতই গ্রহণ করেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।
দরূদ শরীফের বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ তা'আলা যেভাবে আমাদের জড়জগতে ফলফুলের ভিন্ন ভিন্ন রংরূপ দান করেছেন এবং এগুলোর ভিন্ন ভিন্ন সুবাস দিয়েছেন: (ফার্সী কবির ভাষায়: پرگلے رارنگ وبوئے دیگر است) অনুরূপ বিভিন্ন ইবাদত, যিকর ও দু'আর ভিন্ন ভিন্ন খাসিয়াত (বৈশিষ্ট্য) ও বরকত রেখেছেন। দরূদ শরীফের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে খালিস অন্তরে বহুল পরিমাণে দরূদ শরীফ পাঠে আল্লাহর খাস রহমতের দৃষ্টি, রাসূলুল্লাহ (স)-এর রূহানী নৈকট্য এবং তাঁর বিশেষ অনুরাগ লাভের এটি হচ্ছে সবচাইতে খাস ওসীলা। পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহে উল্লিখিত হাদীসগুলো দ্বারা এটাও জানা যাবে যে প্রত্যেকটি উম্মতের দরূদ ও সালাম তার নামধামসহ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট পৌঁছানো হয়ে থাকে। এ জন্যে ফিরিশতাদের রীতিমত একটি বিভাগ রয়েছে।
একটু চিন্তা করুন, আপনি যদি জানতে পারেন, আল্লাহর অমুক বান্দা আপনার জন্যে এবং আপনার পরিবার-পরিজনের জন্যে অহরহ নেক দু'আ করে থাকে। সে তার নিজের জন্যে ততটুকু দু'আ করে না, যতটুকু আপনার জন্যে করে থাকে এবং এটা তার অত্যন্ত প্রিয় কাজ, তাহলে আপনার অন্তরে তার জন্য কতটুকু ভালবাসা এবং তার মঙ্গল কামনার উদ্রেক হতে পারে। তারপর যখনই আল্লাহ্ ঐ বান্দা আপনার সম্মুখে আসবে বা আপনার সাথে দেখা করবে, তখন আপনি তার সাথে কী আচরণ করবেন?
এ উপমা দ্বারা বুঝা যেতে পারে যে, আল্লাহর যে বান্দা ঈমান ও ইখলাস সহকারে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি বহুলভাবে দরূদ ও সালাম পাঠ করবে, তার প্রতি তিনি কতটুকু প্রসন্ন থাকবেন এবং কিয়ামতের দিন তার সাথে তাঁর কী কায়কারবার হবে? আল্লাহর নিকট রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যে মর্যাদার আসন রয়েছে, সে দিকে লক্ষ্য রেখে একটু অনুমান করুন তো, এ বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলা কতটুকু প্রসন্ন থাকবেন এবং তার প্রতি তিনি কতটুকু সদয় থাকবেন।
দরূদ ও সালামের উদ্দেশ্য
এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দরূদ ও সালাম বাহ্যত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আ হলেও যেভাবে অন্যদের জন্যে দু'আ তাদের উপকারার্থে করা হয়ে থাকে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দু'আর উদ্দেশ্য সেরূপ তাঁকে উপকৃত করা থাকে না। আমাদের দু'আর তাঁর আদৌ কোন প্রয়োজন বা মুখাপেক্ষিতা নেই, গরীব-মিসকীনদের হাদিয়া-তুহফার বাদশাহদের কী প্রয়োজন! বরং আল্লাহ তা'আলার যেমন আমাদের বান্দাদের উপর হক হচ্ছে ইবাদত ও স্তব-স্তুতির দ্বারা নিজেদের আবদিয়াত এবং উবুদিয়াত বা দাসত্বের নযরানা তাঁর হুযুরে পেশ করা, এতে আল্লাহর নিজের কোন ফায়দা নেই, বরং তা আমাদের নিজেদেরই ঠেকা! আর এর ফায়দা আমরা নিজেরাই পেয়ে থাকি। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কৃতিত্ব ও কামালাত, তাঁর পয়গম্বরসুলভ খিদমতসমূহ এবং উম্মতের প্রতি তাঁর ইহসানসমূহের প্রেক্ষিতে তাঁর হক হচ্ছে উম্মত তাদের আনুগত্য, নিয়াযমন্দী ও কৃতজ্ঞতার হাদিয়া-নযরানা স্বরূপ দরূদ ও সালাম প্রেরণ করবে। আর যেমনটি উপরে বলা হয়েছে, এর দ্বারা তাঁর উপকার সাধন উদ্দিষ্ট নয় বরং নিজেদেরই উপকার সাধন তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি, আখিরাতের ছাওয়াব, তাঁর মহান রাসূলের রূহানী নৈকট্য এবং তাঁর খাস সদয় দৃষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই দরূদ ও সালাম পাঠ করা হয়ে থাকে। দরূদ পাঠকারীর আসল উদ্দিষ্ট থাকে তাই।
আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দয়াই বলতে হবে যে, তিনি আমাদের দরূদ ও সালামের হাদিয়াটুকু ফিরিশতাদের মাধ্যমে তাঁর রাসূলের খিদমতে পৌঁছিয়ে দেন এবং অনেকের সালাম কবর মুবারকে সরাসরি তাঁকে শুনিয়েও দিয়ে থাকেন। (যেমনটি পরবর্তী হাদীসসমূহ থেকে জানা যাবে।) উপরন্তু আমাদের সালাত ও সালামের অনুপাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি তাঁর দান এবং হুযুর ﷺ-এর দরজা বৃদ্ধিও করে থাকেন।
দরূদ ও সালামের খাস হিকমত
আম্বিয়ায়ে কিরাম বিশেষতঃ সাইয়েদুল আম্বিয়া ﷺ-এর খিদমতে ভক্তি-শ্রদ্ধা, মহব্বত, বিশ্বস্ততা ও কৃতজ্ঞতা মিশ্রিত হাদিয়াস্বরূপ দরূদ ও সালাম প্রেরণের তরীকা নির্ধারণ করার সবচাইতে বড় হিকমত হচ্ছে এই যে, এর দ্বারা শিরকের মূলোচ্ছেদ হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলার পরেই সর্বাধিক সম্মানিত ও পবিত্র সত্তার অধিকারী হচ্ছেন এই আম্বিয়ায়ে কিরাম আলাইহিমুস সালাম। তাঁদের মধ্যেও সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী হচ্ছেন খাতামুন নাবিয়্যীন সাইয়েদিনা হযরত মুহম্মদ মুস্তফা ﷺ। যখন তাঁর ব্যাপারেই এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাঁর প্রতি সালাম ও দরূদ প্রেরণ করতে হবে, (অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাঁর জন্যে বিশেষ রহমত ও নিরাপত্তার দু'আ করতে হবে) তাতে বুঝা গেল যে, তিনিও আল্লাহ তা'আলার রহমত ও সদয় দৃষ্টির মুখাপেক্ষী আর তাঁর হক ও উচ্চতম মর্যাদার দাবি হচ্ছে তাঁর জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে উঁচু থেকে উঁচুতর দু'আ করতে হবে। তারপর শিরকের আর কোন অবকাশই থাকে না। পরম দয়াময় ও বদান্যশীল আল্লাহ তা'আলার কত বড় দয়া ও বদান্যতা যে, তাঁর এ হুকুম আমাদের মতো বান্দা ও উম্মতীদেরকে নবী রাসূলদের, বিশেষত সাইয়েদুল আম্বিয়া বা নবীকূল শিরোমণির জন্যে দু'আকারী বানিয়ে দিয়েছে। যে বান্দা এমন পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারীদের জন্যে দু'আ করে, সে কী করে অন্য মাখলুকের পূজারী হতে পারে?
এ ভূমিকাটির পর এবার সে হাদীসগুলো পাঠ করুন, যেগুলোতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর দরূদ পাঠের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং দরূদের ফযীলত ও বরকতের কথা বর্ণিত হয়েছে।
হাদীসে দরূদ ও সালামের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার ফাযায়েল ও বরকতসমূহ
সালাত ও সালাম তথা দরূদ শরীফ এক প্রকার সর্বোত্তম ও সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন দু'আ, যা আল্লাহ পাকের দরবারে গিয়ে থাকে এবং যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্তার সাথে ঈমানী সম্পর্ক এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার অভিব্যক্তিস্বরূপ তাঁর জন্যে করা হয়ে থাকে। এর আদেশ স্বয়ং আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে পাক কুরআনে ঘোষিত হয়েছে:
{ إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا } [الأحزاب: 56]
এ আয়াতে ঈমানদারদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, তারা যেন আল্লাহর রাসূলের প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করে। (আর এটাই হচ্ছে আয়াতের আসল প্রতিপাদ্য।) এ সম্বোধন ও আদেশের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা এবং এতে জোর দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভূমিকা স্বরূপ বলা হয়েছেঃ
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ
অর্থাৎ নবীর প্রতি সালাত (যার নির্দেশ তোমাদেরকে দেওয়া হচ্ছে) আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর পবিত্র ফিরিশতাকুলের আচরিত অভ্যাস, তোমরাও একে তোমাদের অভ্যাসে পরিণত করে এই প্রিয় ও মুবারক আমলে শরীক হয়ে যাও!
আদেশে দান ও সম্বোধনের এ ভঙ্গিটি কুরআনে পাকে কেবল মাত্র সালাত ও সালামের ক্ষেত্রেই অবলম্বন করা হয়েছে। অন্য কোন আমলের ব্যাপারেই এরূপ বলা হয়নি যে, স্বয়ং আল্লাহ এবং তাঁর ফিরিশতাগণ এরূপ করে থাকেন, সুতরাং তোমরাও এমনটি করবে। নিঃসন্দেহে এটা সালাত ও সালামের অনন্য বৈশিষ্ট্য-এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মকামে-মহবুবিয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্যও বটে।
নবীর প্রতি সালাতের মর্ম এবং একটি সন্দেহ নিরসন
সূরা আহযাবের উক্ত আয়াতের দ্বারা অনেকের মনে একটা খটকা লেগে যায় যে, উক্ত আয়াতে আল্লাহ ও ফিরিশতাদের বেলায়ও সালাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
আবার মু'মিন বান্দাদের বেলায়ও ঐ একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ হাকীকতের দিক থেকে আল্লাহ ফিরিশতাকুল এবং মু'মিন বান্দাদের আমল নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকবে।
আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি যে 'সালাত'-যাকে এ আয়াতে ফিরিশতাদের সাথেও সম্পৃক্ত করে يُصَلُّوْنَ (তাঁরা সকলে সালাত প্রেরণ করেন) বলা হয়েছে এবং সকলের আমলকেই এক শব্দে 'সালাত' বলা হয়েছে, তা তো কোনক্রমেই মু'মিনদেরও আমল হতে পারে না। অনুরূপ, ঈমানদার বান্দাদেরকে صَلُّو বলে যে 'সালাত'-এর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা' কখনো স্বয়ং আল্লাহর কাজ হতে পারে না।
এ সন্দেহ ভঞ্জনের উদ্দেশ্যে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, সালাত শব্দটিকে যখন যার দিকে সম্পৃক্ত বা সম্বোধিত করা হয়, তখন তার হিসাবে তার অর্থ হয়ে থাকে। যখন আল্লাহর দিকে এ শব্দটিকে সম্পৃক্ত করা হয়, তখন তার অর্থ হয় রহমত বর্ষণ করা, আর যখন ফিরিশতাকুল এবং মু'মিনদের সাথে তা সম্পৃক্ত হয়। তখন তার অর্থ হয় আল্লাহর দরবারে রহমত বর্ষণের দু'আ করা। কিন্তু বিশুদ্ধতর কথা হলো, সালাত শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। সম্মানিত করা, প্রশংসা করা, মর্যাদা সমুন্নত করা। প্রীতি বাৎসল্য, বরকত-রহমত, স্নেহ- সোহাগ করা, সদিচ্ছা, নেক দু'আ বা আশীর্বাদ করা এ সব অর্থেই সালাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এজন্যে তা আল্লাহ, ফিরিশতাকুল এবং মু'মিন বান্দাদের সকলের পক্ষ থেকেই সমভাবে হতে পারে। অবশ্য, এটুকু পার্থক্য থাকবে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে 'সালাত' তাঁর উচ্চ শান অনুযায়ীই হবে। ফিরিশতাগণের 'সালাত' হবে তাঁদের মর্যাদা অনুপাতে এবং মু'মিন বান্দাদের সালাত হতে তাঁদের নিজেদের মর্যাদা অনুপাতে।
সে হিসাবে এ আয়াতের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর প্রতি অত্যন্ত সদয় ও প্রসন্ন, তাঁর আদর-সোহাগ অহরহ তাঁর প্রতি বর্ষিত হচ্ছে। তিনি তাঁর প্রশংসায় মুখর এবং উচ্চ থেকে উচ্চতর মর্যাদায় তিনি তাঁকে আসীন করতে যত্নবান। ফিরিশতাগণও তাঁকে অত্যন্ত সম্মান-সমীহ করে থাকেন। তাঁর প্রশংসা ও স্তব-স্তুতিতে তাঁরাও পঞ্চমুখ। সতত তাঁরা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আয়রত। সুতরাং হে মু'মিন বান্দারা! তোমরাও অনুরূপ কর! সর্বদা আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাঁর জন্যে স্নেহ-বাৎসল্য, মর্যাদাবৃদ্ধি, মকামে মাহমূদে আসীন করা এবং গোটা বিশ্বের ইমামত, তাঁর সীমাহীন কবুলিয়াত এবং শাফা'আতের দু'আ করে তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ কর!
সালাত ও সালামের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব
এ আয়াতে যে শানদার ভূমিকা দিয়ে যে গুরুত্ব সহকারে ঈমানদারগণকে সালাত ও সালামের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা থেকেই এর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য এবং আল্লাহর কাছে তা অত্যন্ত প্রিয় আমল হওয়াটা সুস্পষ্ট। পরবর্তী হাদীসগুলো দ্বারা জানা যাবে যে, ঈমানদার বান্দাদের জন্যে তাতে কতটুকু খায়র-বরকত ও রহমত নিহিত রয়েছে।
সালাত ও সালাম সম্পর্কে ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণের বিভিন্ন মসলক
গোটা মুসলিম জাতির ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ প্রায় ঐকমত্য পোষণ করেন যে, সূরা আহযাবের উক্ত আয়াতের নির্দেশ অনুসারে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয। ইমাম শাফেয়ী এবং এক রিওয়ায়াত অনুসারে ইমাম আহমদও বলেন, প্রত্যেক সালাতের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরূদ পাঠ ওয়াজিব। তা না করলে সালাত আদায় হবে না। কিন্তু ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানীফা এবং অধিকাংশ ফকীহগণের অভিমত হলো, শেষ বৈঠক তো নিঃসন্দেহে ওয়াজিব, যাতে প্রাসঙ্গিকভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর দরূদ-সালামও এসে যায়। কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে দরূদ শরীফ পাঠ ফরয বা ওয়াজিব নয়, বরং তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতপূর্ণ সুন্নত-যা ছুটে গেলে সালাতে অনেক কমতি ও অপূর্ণতা রয়ে যায়। কিন্তু এ মতদ্বৈততা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে প্রায় সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন যে, উক্ত আয়াতের নির্দেশ অনুসারে প্রতিটি মুসলমানের উপর ব্যক্তিগতভাবে সালাত ও সালাম প্রেরণ ফরযে আইন, যেমনটি তাঁর রিসালাতের সত্যতার সাক্ষ্যদান ওয়াজিব-যার জন্যে কোন নির্দিষ্ট সময় বা সংখ্যার বাধ্যবাধকতা নেই। এর সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে অন্তত জীবনে একবার তা করতে হবে এবং তার উপর কায়েম থাকতে হবে।
পরবর্তীতে হাদীস আসছে-যদ্বারা জানা যাবে যে, যখনই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নাম বা প্রসঙ্গ আসবে তখনই অতি অবশ্য তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করতে হবে। এ ব্যাপারে অবহেলাকারীর প্রতি কঠোর সতর্কবাণীর কথাও বর্ণিত হবে। এসব হাদীসের ভিত্তিতে অনেক ফকীহর অভিমত হচ্ছে, যখনই কেউ হুযুর পাক ﷺ-এর উল্লেখ করবেন বা অন্য কারো মুখে তাঁর নাম শুনবেন তখন তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ ওয়াজিব। একটি অভিমত হলো একই মজলিসে যদি বারবার তাঁর নাম উচ্চারিত হয় বা তাঁর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়, তখন প্রতিবারই তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ ওয়াজিব হবে। অন্য এক অভিমত হচ্ছে, প্রথমবার দরূদ পাঠ ওয়াজিব এবং পরবর্তী প্রতিবার দরূদ পাঠ মুস্তাহাব। মুহাক্কিক আলিমগণ এ অভিমতই গ্রহণ করেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।
দরূদ শরীফের বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ তা'আলা যেভাবে আমাদের জড়জগতে ফলফুলের ভিন্ন ভিন্ন রংরূপ দান করেছেন এবং এগুলোর ভিন্ন ভিন্ন সুবাস দিয়েছেন: (ফার্সী কবির ভাষায়: پرگلے رارنگ وبوئے دیگر است) অনুরূপ বিভিন্ন ইবাদত, যিকর ও দু'আর ভিন্ন ভিন্ন খাসিয়াত (বৈশিষ্ট্য) ও বরকত রেখেছেন। দরূদ শরীফের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে খালিস অন্তরে বহুল পরিমাণে দরূদ শরীফ পাঠে আল্লাহর খাস রহমতের দৃষ্টি, রাসূলুল্লাহ (স)-এর রূহানী নৈকট্য এবং তাঁর বিশেষ অনুরাগ লাভের এটি হচ্ছে সবচাইতে খাস ওসীলা। পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহে উল্লিখিত হাদীসগুলো দ্বারা এটাও জানা যাবে যে প্রত্যেকটি উম্মতের দরূদ ও সালাম তার নামধামসহ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট পৌঁছানো হয়ে থাকে। এ জন্যে ফিরিশতাদের রীতিমত একটি বিভাগ রয়েছে।
একটু চিন্তা করুন, আপনি যদি জানতে পারেন, আল্লাহর অমুক বান্দা আপনার জন্যে এবং আপনার পরিবার-পরিজনের জন্যে অহরহ নেক দু'আ করে থাকে। সে তার নিজের জন্যে ততটুকু দু'আ করে না, যতটুকু আপনার জন্যে করে থাকে এবং এটা তার অত্যন্ত প্রিয় কাজ, তাহলে আপনার অন্তরে তার জন্য কতটুকু ভালবাসা এবং তার মঙ্গল কামনার উদ্রেক হতে পারে। তারপর যখনই আল্লাহ্ ঐ বান্দা আপনার সম্মুখে আসবে বা আপনার সাথে দেখা করবে, তখন আপনি তার সাথে কী আচরণ করবেন?
এ উপমা দ্বারা বুঝা যেতে পারে যে, আল্লাহর যে বান্দা ঈমান ও ইখলাস সহকারে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি বহুলভাবে দরূদ ও সালাম পাঠ করবে, তার প্রতি তিনি কতটুকু প্রসন্ন থাকবেন এবং কিয়ামতের দিন তার সাথে তাঁর কী কায়কারবার হবে? আল্লাহর নিকট রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যে মর্যাদার আসন রয়েছে, সে দিকে লক্ষ্য রেখে একটু অনুমান করুন তো, এ বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলা কতটুকু প্রসন্ন থাকবেন এবং তার প্রতি তিনি কতটুকু সদয় থাকবেন।
দরূদ ও সালামের উদ্দেশ্য
এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দরূদ ও সালাম বাহ্যত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আ হলেও যেভাবে অন্যদের জন্যে দু'আ তাদের উপকারার্থে করা হয়ে থাকে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দু'আর উদ্দেশ্য সেরূপ তাঁকে উপকৃত করা থাকে না। আমাদের দু'আর তাঁর আদৌ কোন প্রয়োজন বা মুখাপেক্ষিতা নেই, গরীব-মিসকীনদের হাদিয়া-তুহফার বাদশাহদের কী প্রয়োজন! বরং আল্লাহ তা'আলার যেমন আমাদের বান্দাদের উপর হক হচ্ছে ইবাদত ও স্তব-স্তুতির দ্বারা নিজেদের আবদিয়াত এবং উবুদিয়াত বা দাসত্বের নযরানা তাঁর হুযুরে পেশ করা, এতে আল্লাহর নিজের কোন ফায়দা নেই, বরং তা আমাদের নিজেদেরই ঠেকা! আর এর ফায়দা আমরা নিজেরাই পেয়ে থাকি। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কৃতিত্ব ও কামালাত, তাঁর পয়গম্বরসুলভ খিদমতসমূহ এবং উম্মতের প্রতি তাঁর ইহসানসমূহের প্রেক্ষিতে তাঁর হক হচ্ছে উম্মত তাদের আনুগত্য, নিয়াযমন্দী ও কৃতজ্ঞতার হাদিয়া-নযরানা স্বরূপ দরূদ ও সালাম প্রেরণ করবে। আর যেমনটি উপরে বলা হয়েছে, এর দ্বারা তাঁর উপকার সাধন উদ্দিষ্ট নয় বরং নিজেদেরই উপকার সাধন তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি, আখিরাতের ছাওয়াব, তাঁর মহান রাসূলের রূহানী নৈকট্য এবং তাঁর খাস সদয় দৃষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই দরূদ ও সালাম পাঠ করা হয়ে থাকে। দরূদ পাঠকারীর আসল উদ্দিষ্ট থাকে তাই।
আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দয়াই বলতে হবে যে, তিনি আমাদের দরূদ ও সালামের হাদিয়াটুকু ফিরিশতাদের মাধ্যমে তাঁর রাসূলের খিদমতে পৌঁছিয়ে দেন এবং অনেকের সালাম কবর মুবারকে সরাসরি তাঁকে শুনিয়েও দিয়ে থাকেন। (যেমনটি পরবর্তী হাদীসসমূহ থেকে জানা যাবে।) উপরন্তু আমাদের সালাত ও সালামের অনুপাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি তাঁর দান এবং হুযুর ﷺ-এর দরজা বৃদ্ধিও করে থাকেন।
দরূদ ও সালামের খাস হিকমত
আম্বিয়ায়ে কিরাম বিশেষতঃ সাইয়েদুল আম্বিয়া ﷺ-এর খিদমতে ভক্তি-শ্রদ্ধা, মহব্বত, বিশ্বস্ততা ও কৃতজ্ঞতা মিশ্রিত হাদিয়াস্বরূপ দরূদ ও সালাম প্রেরণের তরীকা নির্ধারণ করার সবচাইতে বড় হিকমত হচ্ছে এই যে, এর দ্বারা শিরকের মূলোচ্ছেদ হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলার পরেই সর্বাধিক সম্মানিত ও পবিত্র সত্তার অধিকারী হচ্ছেন এই আম্বিয়ায়ে কিরাম আলাইহিমুস সালাম। তাঁদের মধ্যেও সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী হচ্ছেন খাতামুন নাবিয়্যীন সাইয়েদিনা হযরত মুহম্মদ মুস্তফা ﷺ। যখন তাঁর ব্যাপারেই এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাঁর প্রতি সালাম ও দরূদ প্রেরণ করতে হবে, (অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাঁর জন্যে বিশেষ রহমত ও নিরাপত্তার দু'আ করতে হবে) তাতে বুঝা গেল যে, তিনিও আল্লাহ তা'আলার রহমত ও সদয় দৃষ্টির মুখাপেক্ষী আর তাঁর হক ও উচ্চতম মর্যাদার দাবি হচ্ছে তাঁর জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে উঁচু থেকে উঁচুতর দু'আ করতে হবে। তারপর শিরকের আর কোন অবকাশই থাকে না। পরম দয়াময় ও বদান্যশীল আল্লাহ তা'আলার কত বড় দয়া ও বদান্যতা যে, তাঁর এ হুকুম আমাদের মতো বান্দা ও উম্মতীদেরকে নবী রাসূলদের, বিশেষত সাইয়েদুল আম্বিয়া বা নবীকূল শিরোমণির জন্যে দু'আকারী বানিয়ে দিয়েছে। যে বান্দা এমন পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারীদের জন্যে দু'আ করে, সে কী করে অন্য মাখলুকের পূজারী হতে পারে?
এ ভূমিকাটির পর এবার সে হাদীসগুলো পাঠ করুন, যেগুলোতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর দরূদ পাঠের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং দরূদের ফযীলত ও বরকতের কথা বর্ণিত হয়েছে।
হাদীসে দরূদ ও সালামের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার ফাযায়েল ও বরকতসমূহ
২৯২. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, যে ব্যক্তি একবার আমার প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দশবার সালাম বর্ষণ করেন। (মুসলিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَلَّى عَلَيَّ مَرَّةً وَاحِدَةً، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا» (رواه مسلم)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
উপরে বলা হয়েছে যে, সালাত অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মর্যাদা বৃদ্ধি ও বিশেষ দানকে যেমন সালাত বলা হয়ে থাকে, তেমনি ঈমানদার বান্দাদের প্রতি সাধারণভাবে তাঁর যে রহমত ও করুণা বর্ষিত হয়ে থাকে, তার জন্যেও সালাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ জন্যে হাদীসে ঐ রহমত ও দানের ব্যাপারেও সালাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে-যা দরূদ ও সালামের বিনিময়ে মু'মিন বান্দাদের প্রতি বর্ষিত হয়ে থাকে। বলা হয়েছে : صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ عَشْرًا অর্থাৎ আল্লাহ তার প্রতি দশবার সালাত বর্ষণ করেন। বলাবাহুল্য, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আল্লাহর যে সালাত, অন্য যে কারো প্রতি বর্ষিত সালাতের তুলনায় এ দুই সালাতের পার্থক্য ততটুকুই হবে, যতটুকু পার্থক্য রয়েছে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং ঐ মু'মিন বান্দার মর্যাদার মধ্যে।
পরবর্তী কোন কোন হাদীসের দ্বারা জানা যাবে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আমাদের বান্দাদের সালাত প্রেরণের অর্থ হবে আল্লাহ তা'আলার নিকট সালাত প্রেরণের দু'আ করা।
এটাও বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি হাকীকত বা ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করাই কেবল এ হাদীসের উদ্দেশ্য নয়; বরং ঐ মুবারক ও বরকতপূর্ণ আমল (অর্থাৎ নবীর প্রতি দরূদ)-এর প্রতি উৎসাহিত করাই এর উদ্দেশ্য- যা আল্লাহ তা'আলার সালাত, তখন তাঁর খাস রহমত হাসিল করা এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রূহানী নৈকট্য লাভে ধন্য হওয়ার ওসীলাস্বরূপ। অনুরূপভাবে পরবর্তী আলোচ্য হাদীসগুলোর উদ্দেশ্যও তাই।
পরবর্তী কোন কোন হাদীসের দ্বারা জানা যাবে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আমাদের বান্দাদের সালাত প্রেরণের অর্থ হবে আল্লাহ তা'আলার নিকট সালাত প্রেরণের দু'আ করা।
এটাও বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি হাকীকত বা ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করাই কেবল এ হাদীসের উদ্দেশ্য নয়; বরং ঐ মুবারক ও বরকতপূর্ণ আমল (অর্থাৎ নবীর প্রতি দরূদ)-এর প্রতি উৎসাহিত করাই এর উদ্দেশ্য- যা আল্লাহ তা'আলার সালাত, তখন তাঁর খাস রহমত হাসিল করা এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রূহানী নৈকট্য লাভে ধন্য হওয়ার ওসীলাস্বরূপ। অনুরূপভাবে পরবর্তী আলোচ্য হাদীসগুলোর উদ্দেশ্যও তাই।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)