মা'আরিফুল হাদীস
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
হাদীস নং: ২৬৭
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
তাওবা-ইস্তিগফার
দু'আরই একটি বিশেষ প্রকরণ হচ্ছে ইস্তিগফার বা আল্লাহর দরবারে নিজের গুনাহ-খাতা ও ভুল-ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা। তাওবা হচ্ছে তারই প্রাসঙ্গিক ব্যাপার। বরং তাওবা ও ইস্তিগফার দুটোই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
তাওবার তাৎপর্য্য হচ্ছে, যে গুনাহ বা নাফরমানী বা অপসন্দনীয়-অবাঞ্ছিত আমল বান্দার দ্বারা হয়ে যায়, তার মন্দ পরিণামের ভয়ের সাথে সাথে তার অন্তরে অনুশোচনা সৃষ্টি হয় এবং ভবিষ্যতে এথেকে বেঁচে থাকবে এবং আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিমত তাঁর ফরমানবরদারী করে চলার সঙ্কল্প সে গ্রহণ করে।
বলাবাহুল্য বান্দার অন্তরে যখন এ ভাবের উদ্রেক হবে, তখন তার অতীত গুনাহর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার তাগিদও সে স্বাভাবিকভাবেই এবং অতি অবশ্যই অনুভব করবে যাতে করে সে তার কুফল বা মন্দ পরিণতি থেকে বাঁচতে পারে। এ জন্যেই বলা হয়েছে যে, তাওবা এবং ইস্তিগফার- একটা অপরটার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
তাওবা ও ইস্তিগফারের হাকীকত এ উদাহরণের দ্বারা স্পষ্টরূপে অনুধাবন করা যেতে পারে। ধরুন, কোন ব্যক্তি ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ অবস্থায় আত্মহননের উদ্দেশ্যে বিষ খেয়ে ফেললো। যখন সে বিষ তার পাকস্থলীতে পৌঁছে ক্রিয়া শুরু করলো এবং তার নাড়ি-ভুঁড়ি ছিড়ে যাবার উপক্রম হলো এবং এর বিষক্রিয়া তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠলো এবং চোখের সম্মুখে তার মৃত্যুর দৃশ্য ভেসে উঠলো, তখন তার নির্বুদ্ধিতামূলক আচরণের জন্যে সে খুবই দুঃখিত ও অনুতপ্ত হলো এবং যে কোন মূল্যে প্রাণ রক্ষার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠলো। তখন সে ডাক্তার বা হাকীমের দেওয়া ঔষধ সেবন শুরু করলো। চিকিৎসক বমি করতে বললে বমি করার জন্যেও সে সাধ্যমতো চেষ্টা করতে লাগলো। নিঃসন্দেহে এ মুহূর্তে সে ব্যক্তি সাচ্চা দেলে এ সিদ্ধান্ত বা সংকল্পও গ্রহণ করবে যে, এ যাত্রা যদি বেঁচে যায়, তাহলে আগামীতে আর কখনো এরূপ নির্বুদ্ধিতামূলক কাজ করবে না।
ঠিক এরূপই বুঝে নিন যে, কখনো ঈমানদার বান্দাও গাফলতির অবস্থায় শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে বা নিজ প্রবৃত্তির তাগিদে পাপকর্ম করে বসে। কিন্তু যখন আল্লাহ প্রদত্ত তাওফীকের বলে তার ঈমানী অনুভূতি জাগ্রত হয়ে উঠে এবং সে অনুধাবন করতে সমর্থ হয় যে, আমি আমার মালিক ও মওলার বিরুদ্ধাচরণ বা তাঁর নাফরমানী করে নিজের ধ্বংসই ডেকে এনেছি এবং আল্লাহর রহমত ও দানের পরিবর্তে তাঁর গযব ও শাস্তিকেই নিজের জন্য অপরিহার্য করে তুলেছি, এ অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয়ে যায় তাহলে কবরে এবং তারপর হাশরে না জানি আমার কী দশা হয়, সেখানে আমার মনীবের কাছে আমি মুখ দেখাবো কি করে? আখিরাতের শাস্তিই বা আমি কেমন করে সহ্য করবো?
মোটকথা, আল্লাহ যখন তাকে এ অনুভূতি বা উপলব্ধির তাওফীক দান করেন, তখন সে তার মালিক ও মওলার রহমত ও বদান্যতার প্রতি প্রত্যয়ী হয় যে, তিনি বড় বড় গুনাহও সন্তুষ্ট চিত্তে মাফ করে দিতে পারেন, সে তখন তাঁর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং একেই সে তার গুনাহের বিষের প্রতিকার বলে মনে করে। উপরন্তু ভবিষ্যতের জন্যে সংকল্প করে যে, আর কখনো মালিকের অবাধ্যতায় লিপ্ত হবো না এবং কখনো এ গুনাহের কাছেও ঘেঁষবো না। বান্দার এ আমলের নামই হচ্ছে ইস্তিগফার ও তাওবা।
তাওবা ও ইস্তিগফার হচ্ছে সর্বোচ্চ মকাম
পূর্বে আরয করা হয়েছে যে, আল্লাহর মকবুল ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগণের সর্বোচ্চ মকাম হচ্ছে আবদিয়ত বা বন্দেগীর মকাম, এবং দু'আতে যেহেতু এই আবদিয়ত ও বন্দেগীর অভিব্যক্তি ঘটে থাকে, এজন্যে নবী করীম ﷺ-এর বাণী অনুসারে এটাই مخ العبادة বা ইবাদতের মগজস্বরূপ। এজন্যে মানুষের সর্বোত্তম আমল এবং সর্বোত্তম অবস্থা এবং সর্বাধিক সম্মানের ব্যাপার হচ্ছে তার দু'আ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ বাণীটিও যথাস্থানে সন্নিবেশিত হয়েছে, যাতে তিনি বলেছেন:
لَيْسَ شَيْءٌ أَكْرَمَ عَلَى اللّٰهِ مِنَ الدُّعَاءِ
"আল্লাহর কাছে দু'আর চাইতে বেশি প্রিয় ও মূল্যবান কোন আমল নেই।"
তাওবা ও ইস্তিগফারকালে বান্দা যেহেতু নিজের অপরাধবোধের দরুন অত্যন্ত লজ্জিত-অনুতপ্ত বোধ করে এবং পাপের পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত বলে মালিক মওলাকে মুখ দেখানোর অযোগ্য বলে নিজেকে বিবেচনা করে, এবং নিজেকে অত্যন্ত দোষী ও অপরাধী মনে করে ক্ষমা প্রার্থনা করে ও ভবিষ্যতের জন্যে তাওবা করে; এ জন্যে বন্দেগী, দীনতা-হীনতা ও নিজের গুনাহগার হওয়ার যে উপলব্ধিটুকু তাওবা-ইস্তিগফারকালে থাকে, অন্য কোন দু'আর সময় সেরূপ হয় না। বরং সত্য কথা হলো সেরূপ অন্য সময় হতেই পারে না। এ হিসাবে ইস্তিগফার ও তাওবা আসলে উচ্চমার্গের ইবাদত এবং তা আল্লাহর নৈকট্যের সর্বোচ্চ মকাম। এজন্যে তাওবা ও ইস্তিগফারকারী বান্দার জন্যে কেবল ক্ষমা ও মার্জনাই নয়, আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দান ও তাঁর মহব্বত-ভালবাসার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
সে সব হাদীস একটু পরেই বর্ণনা করা হবে, যা থেকে জানা যাবে যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ অহরহ তাওবা ও ইস্তিগফার করতেন। উপরের বর্ণনার আলোকে তাঁর এ তাওবা ও ইস্তিগফার বহুল পরিমাণে করার কারণটি সহজেই বোধগম্য হবে।
বস্তুত এটি একটি অত্যন্ত মূর্খতা ও ভ্রান্ত ধারণা যে, তাওবা ও ইস্তিগফার হচ্ছে একান্তই আল্লাহর না-ফরমান ও গুনাহগার বা পাপী-তাপীদের কাজ এবং তাদেরই এর প্রযোজন রয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে, আল্লাহর বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দারা এমন কি নবী-রাসূলগণ- যাঁরা গুনাহ থেকে মা'সুম এবং মাহফূয (হিফাযতে) থাকেন,. তাঁদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, সবকিছু করার পরও তাঁরা অনুভব করেন, আল্লাহর বন্দেগীর হক মোটেও আদায় হয়নি, এজন্যে তাঁরা সর্বদা তাওবা ও ইস্তিগফার করতে থাকেন। তাঁরা তাঁদের সকল আমলকে এমন কি তাঁদের সালাতসমূহকেও ইস্তিগফার যোগ্য মনে করে থাকেন।
এই মা'আরিফুল হাদীস সিরিজের তৃতীয় খণ্ডে সালাত অধ্যায়ে হযরত ছাওবান রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সালাতের সালাম ফিরানোর পর তিনবার বলতেন:
اَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ اَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ اَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ইস্তিগফার করছি! ক্ষমা প্রার্থনা করছি!! মা'ফী তলব করছি!!!
সালাত সম্পন্ন করার পর তাঁর এ ইস্তিগফার এ ভিত্তির উপর হতো যে, তিনি উপলব্ধি করতেন, সালাতের হক আদায় করা সম্ভবপর হয়নি। وَاللّٰهُ أَعْلَمُ (আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত।)
মোদ্দা কথা, তাওবা ও ইস্তিগফার পাপী-তাপী গুনাহগারদের জন্যে তাদের পাপতাপ মার্জনা এবং রহমতের মাধ্যম আর আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ও নিষ্পাপ বান্দাদের জন্যে তাঁদের দর্জা ও মহবুবিয়তের উচ্চতম মকামে আরোহণের সোপান স্বরূপ। আল্লাহ তা'আলা এর তাৎপর্য অনুধাবনের তাওফীক এবং সে বোধ ও একীন দান করুন এবং তা থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন!
এ ভূমিকার পর তাওবা ও ইস্তিগফার সংক্রান্ত হাদীছগুলো পাঠ করুন, যাতে তাওবা ও ইস্তিগফারের ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আমল বা আচরণের বর্ণনা রয়েছে।
তাওবা ও ইস্তিগফারের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উসওয়ায়ে হাসানা
দু'আরই একটি বিশেষ প্রকরণ হচ্ছে ইস্তিগফার বা আল্লাহর দরবারে নিজের গুনাহ-খাতা ও ভুল-ত্রুটির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা। তাওবা হচ্ছে তারই প্রাসঙ্গিক ব্যাপার। বরং তাওবা ও ইস্তিগফার দুটোই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
তাওবার তাৎপর্য্য হচ্ছে, যে গুনাহ বা নাফরমানী বা অপসন্দনীয়-অবাঞ্ছিত আমল বান্দার দ্বারা হয়ে যায়, তার মন্দ পরিণামের ভয়ের সাথে সাথে তার অন্তরে অনুশোচনা সৃষ্টি হয় এবং ভবিষ্যতে এথেকে বেঁচে থাকবে এবং আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিমত তাঁর ফরমানবরদারী করে চলার সঙ্কল্প সে গ্রহণ করে।
বলাবাহুল্য বান্দার অন্তরে যখন এ ভাবের উদ্রেক হবে, তখন তার অতীত গুনাহর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনার তাগিদও সে স্বাভাবিকভাবেই এবং অতি অবশ্যই অনুভব করবে যাতে করে সে তার কুফল বা মন্দ পরিণতি থেকে বাঁচতে পারে। এ জন্যেই বলা হয়েছে যে, তাওবা এবং ইস্তিগফার- একটা অপরটার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
তাওবা ও ইস্তিগফারের হাকীকত এ উদাহরণের দ্বারা স্পষ্টরূপে অনুধাবন করা যেতে পারে। ধরুন, কোন ব্যক্তি ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ অবস্থায় আত্মহননের উদ্দেশ্যে বিষ খেয়ে ফেললো। যখন সে বিষ তার পাকস্থলীতে পৌঁছে ক্রিয়া শুরু করলো এবং তার নাড়ি-ভুঁড়ি ছিড়ে যাবার উপক্রম হলো এবং এর বিষক্রিয়া তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠলো এবং চোখের সম্মুখে তার মৃত্যুর দৃশ্য ভেসে উঠলো, তখন তার নির্বুদ্ধিতামূলক আচরণের জন্যে সে খুবই দুঃখিত ও অনুতপ্ত হলো এবং যে কোন মূল্যে প্রাণ রক্ষার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠলো। তখন সে ডাক্তার বা হাকীমের দেওয়া ঔষধ সেবন শুরু করলো। চিকিৎসক বমি করতে বললে বমি করার জন্যেও সে সাধ্যমতো চেষ্টা করতে লাগলো। নিঃসন্দেহে এ মুহূর্তে সে ব্যক্তি সাচ্চা দেলে এ সিদ্ধান্ত বা সংকল্পও গ্রহণ করবে যে, এ যাত্রা যদি বেঁচে যায়, তাহলে আগামীতে আর কখনো এরূপ নির্বুদ্ধিতামূলক কাজ করবে না।
ঠিক এরূপই বুঝে নিন যে, কখনো ঈমানদার বান্দাও গাফলতির অবস্থায় শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে বা নিজ প্রবৃত্তির তাগিদে পাপকর্ম করে বসে। কিন্তু যখন আল্লাহ প্রদত্ত তাওফীকের বলে তার ঈমানী অনুভূতি জাগ্রত হয়ে উঠে এবং সে অনুধাবন করতে সমর্থ হয় যে, আমি আমার মালিক ও মওলার বিরুদ্ধাচরণ বা তাঁর নাফরমানী করে নিজের ধ্বংসই ডেকে এনেছি এবং আল্লাহর রহমত ও দানের পরিবর্তে তাঁর গযব ও শাস্তিকেই নিজের জন্য অপরিহার্য করে তুলেছি, এ অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয়ে যায় তাহলে কবরে এবং তারপর হাশরে না জানি আমার কী দশা হয়, সেখানে আমার মনীবের কাছে আমি মুখ দেখাবো কি করে? আখিরাতের শাস্তিই বা আমি কেমন করে সহ্য করবো?
মোটকথা, আল্লাহ যখন তাকে এ অনুভূতি বা উপলব্ধির তাওফীক দান করেন, তখন সে তার মালিক ও মওলার রহমত ও বদান্যতার প্রতি প্রত্যয়ী হয় যে, তিনি বড় বড় গুনাহও সন্তুষ্ট চিত্তে মাফ করে দিতে পারেন, সে তখন তাঁর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং একেই সে তার গুনাহের বিষের প্রতিকার বলে মনে করে। উপরন্তু ভবিষ্যতের জন্যে সংকল্প করে যে, আর কখনো মালিকের অবাধ্যতায় লিপ্ত হবো না এবং কখনো এ গুনাহের কাছেও ঘেঁষবো না। বান্দার এ আমলের নামই হচ্ছে ইস্তিগফার ও তাওবা।
তাওবা ও ইস্তিগফার হচ্ছে সর্বোচ্চ মকাম
পূর্বে আরয করা হয়েছে যে, আল্লাহর মকবুল ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগণের সর্বোচ্চ মকাম হচ্ছে আবদিয়ত বা বন্দেগীর মকাম, এবং দু'আতে যেহেতু এই আবদিয়ত ও বন্দেগীর অভিব্যক্তি ঘটে থাকে, এজন্যে নবী করীম ﷺ-এর বাণী অনুসারে এটাই مخ العبادة বা ইবাদতের মগজস্বরূপ। এজন্যে মানুষের সর্বোত্তম আমল এবং সর্বোত্তম অবস্থা এবং সর্বাধিক সম্মানের ব্যাপার হচ্ছে তার দু'আ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ বাণীটিও যথাস্থানে সন্নিবেশিত হয়েছে, যাতে তিনি বলেছেন:
لَيْسَ شَيْءٌ أَكْرَمَ عَلَى اللّٰهِ مِنَ الدُّعَاءِ
"আল্লাহর কাছে দু'আর চাইতে বেশি প্রিয় ও মূল্যবান কোন আমল নেই।"
তাওবা ও ইস্তিগফারকালে বান্দা যেহেতু নিজের অপরাধবোধের দরুন অত্যন্ত লজ্জিত-অনুতপ্ত বোধ করে এবং পাপের পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত বলে মালিক মওলাকে মুখ দেখানোর অযোগ্য বলে নিজেকে বিবেচনা করে, এবং নিজেকে অত্যন্ত দোষী ও অপরাধী মনে করে ক্ষমা প্রার্থনা করে ও ভবিষ্যতের জন্যে তাওবা করে; এ জন্যে বন্দেগী, দীনতা-হীনতা ও নিজের গুনাহগার হওয়ার যে উপলব্ধিটুকু তাওবা-ইস্তিগফারকালে থাকে, অন্য কোন দু'আর সময় সেরূপ হয় না। বরং সত্য কথা হলো সেরূপ অন্য সময় হতেই পারে না। এ হিসাবে ইস্তিগফার ও তাওবা আসলে উচ্চমার্গের ইবাদত এবং তা আল্লাহর নৈকট্যের সর্বোচ্চ মকাম। এজন্যে তাওবা ও ইস্তিগফারকারী বান্দার জন্যে কেবল ক্ষমা ও মার্জনাই নয়, আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দান ও তাঁর মহব্বত-ভালবাসার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
সে সব হাদীস একটু পরেই বর্ণনা করা হবে, যা থেকে জানা যাবে যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ অহরহ তাওবা ও ইস্তিগফার করতেন। উপরের বর্ণনার আলোকে তাঁর এ তাওবা ও ইস্তিগফার বহুল পরিমাণে করার কারণটি সহজেই বোধগম্য হবে।
বস্তুত এটি একটি অত্যন্ত মূর্খতা ও ভ্রান্ত ধারণা যে, তাওবা ও ইস্তিগফার হচ্ছে একান্তই আল্লাহর না-ফরমান ও গুনাহগার বা পাপী-তাপীদের কাজ এবং তাদেরই এর প্রযোজন রয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে, আল্লাহর বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দারা এমন কি নবী-রাসূলগণ- যাঁরা গুনাহ থেকে মা'সুম এবং মাহফূয (হিফাযতে) থাকেন,. তাঁদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, সবকিছু করার পরও তাঁরা অনুভব করেন, আল্লাহর বন্দেগীর হক মোটেও আদায় হয়নি, এজন্যে তাঁরা সর্বদা তাওবা ও ইস্তিগফার করতে থাকেন। তাঁরা তাঁদের সকল আমলকে এমন কি তাঁদের সালাতসমূহকেও ইস্তিগফার যোগ্য মনে করে থাকেন।
এই মা'আরিফুল হাদীস সিরিজের তৃতীয় খণ্ডে সালাত অধ্যায়ে হযরত ছাওবান রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সালাতের সালাম ফিরানোর পর তিনবার বলতেন:
اَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ اَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ اَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ইস্তিগফার করছি! ক্ষমা প্রার্থনা করছি!! মা'ফী তলব করছি!!!
সালাত সম্পন্ন করার পর তাঁর এ ইস্তিগফার এ ভিত্তির উপর হতো যে, তিনি উপলব্ধি করতেন, সালাতের হক আদায় করা সম্ভবপর হয়নি। وَاللّٰهُ أَعْلَمُ (আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত।)
মোদ্দা কথা, তাওবা ও ইস্তিগফার পাপী-তাপী গুনাহগারদের জন্যে তাদের পাপতাপ মার্জনা এবং রহমতের মাধ্যম আর আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ও নিষ্পাপ বান্দাদের জন্যে তাঁদের দর্জা ও মহবুবিয়তের উচ্চতম মকামে আরোহণের সোপান স্বরূপ। আল্লাহ তা'আলা এর তাৎপর্য অনুধাবনের তাওফীক এবং সে বোধ ও একীন দান করুন এবং তা থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন!
এ ভূমিকার পর তাওবা ও ইস্তিগফার সংক্রান্ত হাদীছগুলো পাঠ করুন, যাতে তাওবা ও ইস্তিগফারের ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আমল বা আচরণের বর্ণনা রয়েছে।
তাওবা ও ইস্তিগফারের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উসওয়ায়ে হাসানা
২৬৭. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: আল্লাহর কসম, আমি দিনে সত্তর বারেরও অধিক আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাওবা-ইস্তিগফার করে থাকি।
(সহীহ্ বুখারী)
(সহীহ্ বুখারী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَاللَّهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي اليَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً» (رواه البخارى)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
আল্লাহ তা'আলার মাহাত্ম্য, তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পর্কে যে বান্দার অনুভূতি যে পর্যায়ের হবে, সে সে অনুযায়ী নিজেকে উবুদিয়ত বা দাসত্বের হক আদায়ে অপরাধী বলে মনে করবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অবস্থান যেহেতু এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তাই তাঁর এ অনুভূতিও ছিল সর্বাধিক। এজন্যে তাঁর মধ্যে এ অনুভূতি অত্যন্ত কার্যকরীভাবে বিদ্যমান ছিল যে, আমি উবুদিয়তের হক আদায় করতে পারিনি। এজন্যে তিনি ঘন ঘন তাওবা ইস্তিগফার করতেন এবং তার অভিব্যক্তি ঘটিয়ে অন্যদেরকেও তা শিক্ষা দিতেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)