মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়

হাদীস নং: ২৫৩
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
আশ্রয় প্রার্থনামূলক দু'আসমূহ

হাদীস ভান্ডারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে কৃত যে সব দু'আর বর্ণনা পাওয়া যায়, তার অধিকাংশই হচ্ছে ঐ জাতীয়, যে গুলোতে তিনি আল্লাহর দরবারে কোন ইহলৌকিক বা পারলৌকিক, কোন আত্মিক বা দৈহিক, ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত নিয়ামত বা মঙ্গলের প্রার্থনা করেছেন এবং ইতিবাচক ভাবে কোন প্রয়োজন পূরণের বা অভাব মোচনের দু'আ করেছেন। এ পর্যন্ত এ জাতীয় দেড় শতাধিক দু'আ এ পুস্তকে সন্নিবেশিত হয়েছে।

এগুলো ছাড়াও এমন অনেক দু'আ এতে বর্ণিত হয়েছে, যে গুলোতে ইতিবাচক ভাবে কোন মঙ্গল ও নিয়ামতের বা প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা না করে ইহলৌকিক বা পারলৌকিক কোন অনিষ্ট থেকে বা কোন বালা-মুসীবত থেকে আশ্রয় ও হিফাযতের দু'আ করেছেন এবং উম্মতকেও তা শিক্ষা দিয়েছেন। এ সমস্ত দু'আকে সামগ্রিকভাবে সম্মুখে রেখে যে ভাবে একথাটি বলা একান্তই ন্যায্য ও যথার্থ যে, ইহকাল-পরকালের হেন কোন মঙ্গল বা প্রয়োজন নেই, যার দু'আ আল্লাহর রাসূল ﷺ আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে করেননি। এবং যার শিক্ষা তিনি উম্মতকে দেননি। ঠিক তেমনি এই দ্বিতীয় প্রকারের দু'আগুলোকে সামগ্রিক ভাবে সম্মুখে রেখে একান্তই ন্যায্য ও যথার্থ ভাবে বলা যায় যে, ইহকাল ও পরকালের হেন কোন অমঙ্গল বা অনিষ্ট নেই, হেন কোন ফিৎনা-ফ্যাসাদ-বিপর্যয় ও বালামুসীবত আল্লাহর দুনিয়ায় নেই, যাত্থেকে আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করেননি এবং উম্মতকে তার শিক্ষা দেননি। চিন্তাশীল ও সমঝদার লোকদের জন্যে এটা এ হিসাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি উজ্জ্বল মু'জিযা যে তাঁর দু'আ সমূহে মানব জাতির ইহকালীন-পরকালীন, আত্মিক ও দৈহিক, ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত, যাহেরী ও বাতেনী ইতিবাচক ও নেতিবাচক সর্বপ্রকারের প্রয়োজন ব্যক্ত হয়েছে। কোন গোপন থেকে গোপনতর, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর মানবীয় প্রয়োজন বা অভাব খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার প্রার্থনা তিনি সর্বোত্তম ভাষা ও ভঙ্গিতে সর্বোত্তম শব্দমালা প্রয়োগে করেননি বা উম্মতকে তার শিক্ষা দেননি। কুরআন মজীদেও এ দ্বিবিধ অর্থাৎ ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু'আ সমূহ মওজুদ রয়েছে এবঙ এর সর্বশেষ দু'টি সূরাই

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ

আগাগোড়া আশ্রয় প্রার্থনার বক্তব্যই ধারণ করছে। এ জন্যে এ দু'টি সূরাকে معوذتين (মুআব্বেযাতায়ন) বা আশ্রয় প্রর্থনা মূলক সূরাদ্বয় বলে অভিতিহ করা হয়ে থাকে এবং এ দু'টি সূরার মাধ্যমেই কুরআন শরীফ সমাপ্ত করা হয়েছে।

এ কুরআনী পদ্ধতি অনুসারেই এ লেখকের কাছেও এটাই সমীচীন মনে হয়েছে যে, হাদীসে উক্ত যে সব দু'আর নানারূপ অনিষ্ট ফিৎনা-ফ্যাসাদ, বালা-মুসীবত, মন্দ আমল, মন্দ স্বভাব এবং সর্ব প্রকার অবাঞ্ছিত ব্যাপার-স্যাপার থেকে আল্লাহ তা'আলার দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে সেগুলো সর্বশেষে বর্ণনা করি এবং এ গুলোর মাধ্যমেই মা'আরিফুল হাদীসের এ সিলসিলার সমাপ্তি রেখা টানি।

এবার সহৃদয় পাঠক নিম্নে এ জাতীয় হাদীসগুলো পাঠ করুন:
২৫৩. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর কঠোর বালা-মুসীবত থেকে, ভাগ্য বিড়ম্বনায় পাওয়া থেকে, মন্দ তকদীর থেকে এবং শত্রুদের উল্লাস থেকে।
-(সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ جَهْدِ البَلاَءِ، وَدَرَكِ الشَّقَاءِ، وَسُوءِ القَضَاءِ، وَشَمَاتَةِ الأَعْدَاءِ» (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসে বাহ্যিক ভাবে তো চারটি বস্তু থেকে আশ্রয় প্রার্থনার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে দুনিয়া ও আখিরাতের কোন অনিষ্ট, কোন কষ্ট, কোন বালা-মুসীবত এবং পেরেশানী এমন খুঁজে পাওয়া যায়না, যা এ চারটির কোন না কোনটির আওতায় পড়ে না।

এ চারটির প্রথমটি হচ্ছে جَهْدُ البَلاءِ (জাহদুল বালা)-কোন বালা-মুসীবতের প্রাবল্য। বালা হচ্ছে এমন প্রতিটি অবস্থা, যা মানুষের জন্য বিব্রতকর ও কষ্টদায়ক হয়ে থাকে এবং যাতে তার কঠিন পরীক্ষা হয়ে থকে। এটা দুনিয়াবীও হতে পারে আবার। তা দীনীও হতে পারে, ব্যক্তিগত পর্যায়েরও হতে পারে, আবার তা সমষ্টিগতও হতে পারে। মোদ্দা কথা, এই একটি মাত্র শব্দ সমস্ত বালা-মুসীবত ও আপদ-বিপদের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। দ্বিতীয় যে বস্তুটি থেকে এ হাদীসে আশ্রয় প্রার্থনা করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে, তা হলো دَرْكُ الشَّقَاءِ বা ভাগ্য বিড়ম্বনায় পেয়ে যাওয়া। তৃতীয় ব্যাপার হচ্ছে سُوءُ القَضَاءِ বা মন্দ তকদীর। এ দুটি ব্যাপারে ব্যাপকতাও ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। যে বান্দা সর্বপ্রকার ভাগ্য বিড়ম্বনা ও মন্দ তকদীর থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় ও হিফাযত লাভ করেছে, নিঃসন্দেহে সে সবকিছুই পেয়ে গিয়েছে। সর্বশেষে যে ব্যাপারটি থেকে এ দু'আতে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে, তা হচ্ছে شَمَاتَةُ الْأَعْدَاءِ বা শত্রুর উল্লাস অর্থাৎ কোন বিপদ বা ব্যর্থতা দেখে শত্রুদের হাসাহাসি। নিঃসন্দেহে শত্রুদের এ হাসাহাসি এবং খোঁটা দেওয়া অনেক সময় অত্যন্ত মনঃকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে তা থেকে বিশেষ ভাবে আশ্রয় প্রার্থনার জন্যে স্বতন্ত্রভাবে বলা হয়েছে-যদিও পূর্বের তিনটির মধ্যেও এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এ আদেশের তা'মিল এবং উক্ত চারটি ব্যাপার থেকে আশ্রয় প্রার্থনার যথার্থ শব্দমালা হবে এরূপঃ
اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ جَهْدِ الْبَلَاءِ وَدَرْكَ الشَّقَاءِ وَسُوءِ القَضَاءِ وَشَمَاتَةِ الْأَعْدَاءِ
"হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি বালা-মুসীবতের প্রাবল্য থেকে, ভাগ্য বিড়ম্বনায় পাওয়া থেকে, মন্দ তাকদীর থেকে এবং শত্রুর হাসাহাসি বা খোঁটা থেকে।"
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান