মা'আরিফুল হাদীস

হজ্ব অধ্যায়

হাদীস নং: ২১৩
হজ্ব অধ্যায়
মদীনা শরীফের মর্যাদা ও ভালবাসা
২১৩. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারী তাবেয়ী থেকে মুরসাল পদ্ধতিতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) (মদীনার কবরস্তানের পাশে) বসা ছিলেন এবং এ সময় একটি কবর খোঁড়া হচ্ছিল। এক ব্যক্তি কবরে উকি দিয়ে দেখল এবং বলে ফেলল, মু'মিনের জন্য এটা কতইনা মন্দ স্থান। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: তুমি কী মন্দ কথাইনা বললে। (একজন মুসলমানের মদীনায় মৃত্যু এসেছে আর এখানেই তার কবর হয়েছে, আর তুমি বলছ যে, মুসলমানের জন্য এ শয়নস্থল ভাল নয়) লোকটি বলল, আমার উদ্দেশ্য এটা নয়: (যে, মদীনায় মৃত্যু ও কবর হওয়া ভাল নয়) বরং আমার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর রাহে শহীদী মৃত্যু। (অর্থাৎ, আমি এটা বলতে চেয়েছিলাম যে, এ লোকটি বিছানায় পড়ে মরে ও এ স্থানে দাফন হওয়ার পরিবর্তে যদি কোন জেহাদের ময়দানে শহীদ হয়ে যেত এবং তার রক্তমাখা লাশ সেখানে পড়ে থাকত, তাহলে এ কবরে দাফন হওয়ার চেয়ে সেটা অনেক ভাল হত।) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বললেন: এ মৃত্যু আল্লাহর রাহে শহীদী মৃত্যুর সমান তো নয়, (অর্থাৎ, শাহাদতের মর্তবা তো অনেক উচ্চে, কিন্তু মদীনায় মৃত্যুবরণ করা এবং এ মাটিতে দাফন হওয়াও বিরাট সৌভাগ্য।) আল্লাহর যমীনে এমন কোন স্থান নেই যেখানে আমার কবর হওয়া মদীনা অপেক্ষা আমার নিকট প্রিয়তর হতে পারে। কথাটি তিনি তিনবার বললেন। মুয়াত্তা মালেক
کتاب الحج
عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم جَالِساً. وَقَبْرٌ يُحْفَرُ بِالْمَدِينَةِ. فَاطَّلَعَ رَجُلٌ فِي الْقَبْرِ. فَقَالَ : بِئْسَ مَضْجَعُ الْمُؤْمِنِ.فَقَالَ : رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : « بِئْسَ مَا قُلْتَ » .قَالَ الرَّجُلُ : إِنِّي لَمْ أُرِدْ هذَا ، إِنَّمَا أَرَدْتُ الْقَتْلَ فِي سَبِيلِ اللهِ.فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم : « لاَ مِثْلَ لِلْقَتْلِ فِي سَبِيلِ اللهِ. مَا عَلَى الْأَرْضِ بُقْعَةٌ أَحَبُّ إِلَيَّ أَنْ يَكُونَ قَبْرِي فِيْهَا ، مِنْهَا. ثَلاَثَ مَرَّاتٍ » (رواه مالك مرسلا)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ কথার মর্ম বাহ্যত এই যে, আল্লাহর পথে শাহাদত লাভের ফযীলত ও মাহাত্ম্য অবশ্যই স্বীকৃত এবং বিছানায় পড়ে মরা ও জেহাদের ময়দানে আল্লাহর জন্য জীবন উৎসর্গ করা সমান নয়; কিন্তু মদীনায় মৃত্যুবরণ করা ও এখানে করবস্থ হওয়াও বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়। আমি নিজেও এর আকাঙ্ক্ষা করি।

ইমাম বুখারী (রহঃ) নিজ কিতাব বুখারী শরীফের কিতাবুল হজ্বের একেবারে শেষে মদীনা শরীফের ফযীলত সম্পর্কীয় হাদীসসমূহ উল্লেখ করার পর এর সমাপ্তি টেনেছেন আমীরুল মু'মিনীন হযরত উমর রাযি.-এর এ প্রসিদ্ধ দু‘আর উপরঃ
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ، وَاجْعَلْ مَوْتِي فِي بَلَدِ رَسُولِكَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ،
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে তোমার পথে শহীদ হওয়ার মর্যাদাও দান কর এবং তোমার রাসূলের শহর মদীনায় আমার মৃত্যু নছীব কর।

এ দু‘আর ঘটনা ইবনে সা'দ বিশুদ্ধ সনদে এ বর্ণনা করেছেন যে, আউফ ইবনে মালেক আশজায়ী স্বপ্ন দেখলেন যে, হযরত উমর রাযি.-কে শহীদ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি এ স্বপ্নের কথা হযরত উমরকে বললেন। হযরত উমর তখন খুব আক্ষেপের সাথে বললেন:
أَنَّى لِيْ بِالشَّهَادَةِ وَأَنَا بَيْنَ ظَهْرَانَيْ جَزِيْرَةِ الْعَرَبِ لَسْتُ أَغْزُوْ وَالنَّاسُ حَوْلِيْ
অর্থাৎ আমি শাহাদাত কিভাবে লাভ করবো, অথচ আমি জাযীরাতুল আরবে অবস্থান করছি (আর এসব দারুল ইসলাম হয়ে গিয়েছে।) আমি নিজে জেহাদ করি না আর সবসময়ই আমার আশপাশে লোকজন থাকে। তারপর নিজেই বললেন, بَلَى يَاْتِىْ بِهَا اللهُ اِنْ شَاءَ অর্থাৎ, আমার শাহাদত কেন নছীব হবে না? আল্লাহ্ যদি চান, তাহলে এসব অবস্থার মধ্যেও তিনি আমাকে শাহাদতের সৌভাগ্য দান করবেন। তারপর তিনি আল্লাহ্ তা'আলার কাছে ঐ দু‘আটি করলেন- যা উপরে লিখে আসা হয়েছে:
أَنَّى لِيْ بِالشَّهَادَةِ وَأَنَا بَيْنَ ظَهْرَانَيْ جَزِيْرَةِ الْعَرَبِ لَسْتُ أَغْزُوْ وَالنَّاسُ حَوْلِيْ
হযরত উমরের মুখে একথা শুনে তাঁর কন্যা হযরত হাফছা বললেন, এটা কিভাবে হতে পারে যে, আপনি আল্লাহর পথে শহীদও হবেন, আবার আপনার মৃত্যুও মদীনায় হবে। তিনি উত্তর দিলেন: আল্লাহর ইচ্ছা হলে এ দু'টিই আমার ভাগ্যে জুটবে।

এ ধারার রেওয়ায়তগুলোতে এ কথাও এসেছে যে, হযরত উমর রাযি.-এর এ আশ্চর্য বরং বাহ্যত অসম্ভব দু‘আর কারণে মানুষ আশ্চর্যবোধ করত এবং কারো বুঝেই আসত না যে, দুটি বিষয়ই কেমন করে সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যখন আবু লু'লু মজুসী মসজিদে নববীর মেহরাবে তাঁকে আহত করে ফেলল, তখন সবাই বুঝতে পারল যে, দু‘আটি এভাবে কবুল হওয়ার ছিল।

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা করেন, তখন ঐ জিনিস সংঘটিত করে দেখান, যার সম্ভাবনার ব্যাপারেও মানুষের জ্ঞান সন্দেহ করে। اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান