মা'আরিফুল হাদীস

হজ্ব অধ্যায়

হাদীস নং: ১৪৫
হজ্ব অধ্যায়
আগেই যেমন জানা গিয়েছে যে, ইসলামের পাঁচটি মৌলিক বিধানের মধ্যে শেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের বিধান হচ্ছে বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্ব। হজ্ব আসলে কি? একটি নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত সময়ে আল্লাহর আশেকদের মত তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়া, তাঁর প্রিয় বন্ধু হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের ভক্তি ও ভালবাসার খেলা ও তাঁর রীতি-পদ্ধতির বাস্তব অনুশীলন করে তাঁর মত ও পথের সাথে নিজের সংশ্লিষ্টতা ও বিশ্বস্ততার প্রমাণ পেশ করা, নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী ইব্রাহীমী আবেগ-অনুভূতিতে অংশ গ্রহণ করা এবং নিজেকে তাঁরই রংয়ে রঙিয়ে তোলা।

আরেকটু স্পষ্ট করার জন্য বলা যায় যে, আল্লাহ্ তা'আলার একটি শান এই যে, তিনি পরম প্রতাপশালী, আহকামুল হাকেমীন এবং সকল বাদশাহর বাদশাহ, আর আমরা হচ্ছি তার অক্ষম ও মুখাপেক্ষী বান্দা এবং তাঁর মালিকানার গোলাম। আল্লাহর দ্বিতীয় শানটি এই যে, তিনি ঐ সকল সৌন্দর্যগুণে ষোল আনা গুণান্বিত, যেগুলোর কারণে মানুষের মধ্যে কারও প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি; বরং কেবল তিনিই প্রকৃত প্রেমাস্পদ। আল্লাহ তা'আলার প্রথম (শাসক ও বাদশাহী) শানের দাবী এই যে, বান্দা তাঁর দরবারে আদব ও ভক্তির চিত্র হয়ে উপস্থিত হবে। ইসলামের আরকানসমূহের মধ্যে প্রথম ব্যবহারিক রুকন নামায এরই বিশেষ প্রতিচ্ছবি এবং এতে এই রূপটিই প্রবল। আর যাকাতও এই সম্পর্কেরই অন্য একটি দিককে প্রকাশ করে।

আল্লাহ তা'আলার দ্বিতীয় শান (প্রেমাস্পদ হওয়া)-এর দাবী এই যে, তাঁর সাথে বান্দার ভালবাসা ও প্রেমের সম্পর্ক থাকবে। রোযার মধ্যেও এর কিছুটা রূপ লক্ষ্য করা যায়। পানাহার ত্যাগ করে দেওয়া এবং নফসের দাবী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এটা প্রেম ও ভালবাসারই একটি অধ্যায়। কিন্তু হজ্ব হচ্ছে এর পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। সেলাই করা কাপড়ের স্থলে একটি কাফন সদৃশ পোশাক পরিধান করা, খালি মাথায় থাকা, ক্ষৌরকার্য না করা, নখ না কাটা, চুলে চিরুনি ব্যবহার না করা, তেল না লাগানো, সুগন্ধি ব্যবহার না করা, চিৎকার করে করে লাব্বাইক বলা, বায়তুল্লাহর চতুষ্পাশ্বে প্রদক্ষিণ করা, এর এক কোণে রাখা কালো পাথরে (হাজরে আসওয়াদ) চুমু খাওয়া, এর দরজা ও দেয়ালে আঁকড়ে ধরা ও রোনাজারী করা, তারপর সাফা-মারওয়ায় চক্কর দেওয়া, তারপর মক্কা শহর থেকেও বের হয়ে যাওয়া এবং কখনও মিনায়, কখনও আরাফাতে আর কখনও মুযদালিফার প্রান্তরে গিয়ে পড়ে থাকা, তারপর আবার জামারাতে গিয়ে কংকর নিক্ষেপ করা- এসকল কাজ ও আচরণ ঠিক তাই, যা প্রকৃত প্রেমিকদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম যেন এই প্রেমরীতির উদ্ভাবক ও প্রতিষ্ঠাতা। আল্লাহ্ তা'আলার কাছে তাঁর এই প্রেমিকসূলভ কাজগুলো এমন পছন্দ হয়েছে যে, তিনি আপন দরবারের বিশেষ উপস্থিতি তথা হজ্ব ও উমরার আরকান ও আমল এগুলোকেই সাব্যস্ত করেছেন। এসব কাজের সমষ্টিরই নাম যেন হজ্ব- যা ইসলামের শেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের রুকন।

এ মা'আরিফুল হাদীস সিরিজের প্রথম খন্ড কিতাবুল ঈমানে ঐসব হাদীস অতিক্রান্ত হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ইসলামের পঞ্চ আরকানের বর্ণনা রয়েছে এবং এগুলোর শেষ রুকন বায়তুল্লাহর হজ্বকে বলা হয়েছে।
হজ্ব ফরয হওয়ার বিধানটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী নবম হিজরীতে এসেছে এবং পরবর্তী বছর দশম হিজরীতে নিজের ওফাতের মাত্র তিন মাস পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামের বিরাট জামা'আতসহ হজ্ব আদায় করেন- যা বিদায় হজ্ব নামে প্রসিদ্ধ। এ বিদায় হজ্বেই আরাফার ময়দানে হুযুর (ﷺ)-এর উপর এ আয়াতটি নাযিল হয় : اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَاَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ অর্থাৎ, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পরিসমাপ্ত করে দিলাম। এ আয়াতে এদিকে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে যে, হজ্ব হচ্ছে ইসলামের পরিপূর্ণতা দানকারী রুকন।

কোন বান্দার ভাগ্যে যদি সঠিক ও আন্তরিকতাপূর্ণ হজ্ব নছীব হয়ে যায়- যাকে শরী‘আতের ভাষায় 'হজ্বে মাবরুর' বলা হয় এবং সে যদি ইব্রাহীমী ও মুহাম্মদী সম্পর্কের সামান্য অংশও লাভ করতে পারে, তাহলে সে যেন সৌভাগ্যের উঁচু মর্তবা লাভ করে নিল এবং ঐ মহান নেয়ামত তার হাতে এসে গেল- যার চাইতে বড় কোন নেয়ামতের কল্পনাও এ দুনিয়াতে করা যায় না। সে তখন এ নেয়ামতের শুকরিয়া হিসাবে বলতে পারে এবং জোশ ও উন্মত্ততার সাথে বলতে পারে:

نازم بچشم خود کہ جمالِ تو دیده است. افتم بہ پائے خود کہ مکویت رسیدہ است
ہر دم ہزار بوسہ زنم دست خویش را. کہ دامنت گرفتہ بسویم کشیدہ است

আমি আমার এ চোখ নিয়ে গর্ব করতে পারি যে, সে তোমার সৌন্দর্য দর্শন করেছে, আমার পা দু'টি নিয়েও আমি গর্বিত যে, এগুলো তোমার গলিতে পৌছেছে। প্রতি মুহূর্তে আমি নিজের হাতে হাজার চুমু খাই, এজন্য যে, সে তোমার আঁচল ধরে আমার দিকে তোমাকে টেনে নিয়ে এসেছে।
এ সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর এবার হজ্ব সম্পর্কে নিম্নের হাদীসগুলো পাঠ করে নিন।
১৪৫. হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একদিন আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং এতে বললেন: হে লোক সকল! আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের উপর হজ্ব ফরয করে দিয়েছেন। অতএব, তোমরা হজ্ব আদায় কর। এক ব্যক্তি নিবেদন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! প্রতি বছরই কি হজ্ব করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চুপ থাকলেন এবং কোন উত্তর দিলেন না। এমনকি সে তিনবার একই প্রশ্ন করতে থাকল। শেষে তিনি (কিছুটা অসন্তুষ্টির সাথে) বললেন, আমি যদি হ্যাঁ বলে দিতাম, তাহলে প্রতি বছরই হজ্ব করা ফরয হয়ে যেত, অথচ তোমরা তা করতে পারতে না। তারপর বললেন, কোন ব্যাপারে আমি নিজে যে পর্যন্ত কোন নির্দেশ না দেই, সে পর্যন্ত আমাকে ছেড়ে দাও (এবং প্রশ্ন করে করে নিজেদের উপর কাঠিন্য আরোপ করার চেষ্টা করো না) কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীদের কাছে বেশী প্রশ্ন করে এবং মতবিরোধে লিপ্ত হয়েই ধ্বংস হয়েছে। তাই আমি যখন তোমাদেরকে কোন বিষয়ের নির্দেশ দেই, তখন তোমরা নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী এটা পালন করে যাও, আর যখন কোন বিষয় থেকে নিষেধ করি, তখন তা পরিহার কর। মুসলিম
کتاب الحج
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : خَطَبَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَ : « يَأَيُّهَا النَّاسُ قَدْ فَرَضَ اللهُ عَلَيْكُمُ الْحَجَّ ، فَحُجُّوا » ، فَقَالَ رَجُلٌ : أَكُلَّ عَامٍ يَا رَسُولَ اللهِ؟ فَسَكَتَ حَتَّى قَالَهَا ثَلَاثًا ، فَقَالَ : " لَوْ قُلْتُ : نَعَمْ لَوَجَبَتْ ، وَلَمَا اسْتَطَعْتُمْ " ، ثُمَّ قَالَ : « ذَرُونِي مَا تَرَكْتُكُمْ ، فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ ، فَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ ، وَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَدَعُوهُ » (رواه مسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

তিরমিযী শরীফ ইত্যাদি হাদীসগ্রন্থে প্রায় এ বিষয়বস্তুরই একটি হাদীস হযরত আলী রাযি. থেকেও বর্ণিত হয়েছে। এতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে হজ্ব ফরয হওয়ার এ ঘোষণা এবং এর উপর হযরত আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদীসে উল্লেখিত এই প্রশ্নোত্তরটি সূরা আলে ইমরানের এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর হয়েছিল: وَلِلّٰہِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الۡبَیۡتِ مَنِ اسۡتَطَاعَ اِلَیۡہِ سَبِیۡلًا আল্লাহর উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর হজ্ব করা ফরয- তাদের উপর, যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর এ হাদীসে ঐ সাহাবীর নাম উল্লেখ করা হয়নি যিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "প্রতি বছরই কি হজ্ব করা ফরয?" কিন্তু হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বর্ণিত এক হাদীসে (যা ইমাম আহমাদ, নাসায়ী ও দারেমী বর্ণনা করেছেন) এ কথার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, এ প্রশ্নকারী ছিলেন আকরা ইবনে হাবেস তামীমী। তিনি মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাই দ্বীনি শিক্ষা-দীক্ষার তেমন সুযোগ লাভ করতে পারেন নি। এ কারণেই তিনি এভাবে প্রশ্ন করে বসেছিলেন। হুযুর (ﷺ) যখন প্রথমে কোন উত্তর দিলেন না, তখন তিনি দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারও একই প্রশ্ন করলেন।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে বলেছেন: "আমি যদি হ্যাঁ বলে দিতাম, তাহলে প্রতি বছরই হজ্ব করা ফরয হয়ে যেত।" এর উদ্দেশ্য ও মর্ম এই যে, প্রশ্নকারীকে এটা চিন্তা করা ও বুঝা উচিত ছিল যে, আমি হজ্ব ফরয হওয়ার যে নির্দেশ শুনিয়েছি, এর দাবী ছিল জীবনে মাত্র একবার হজ্ব করা। তারপর এমন প্রশ্ন করার ফল এটাও হতে পারত যে, আমি যদি হ্যাঁ বলে দিতাম (আর এ কথা স্পষ্ট যে, তিনি হ্যাঁ, তখনই বলতেন, যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এর হুকুম থাকত।) তাহলে প্রতি বছর হজ্ব করা ফরয হয়ে যেত এবং উম্মত খুবই মুশকিলে পড়ে যেত। তারপর তিনি বললেন, পূর্ববর্তী উম্মতদের অনেকেই বেশী বেশী প্রশ্ন করা ও বাদানুবাদে লিপ্ত হওয়ার মন্দ অভ্যাসের কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তারা নিজেদের নবীর কাছে প্রশ্ন করে করে শরী‘আতের বাধ্যবাধকতা তারা অনেক বাড়িয়ে নিয়েছিল। তারপর এগুলোর উপর আর আমল করতে পারে নি।

হাদীসের শেষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন: "আমি যখন তোমাদেরকে কোন বিষয়ের নির্দেশ দেই, তখন তোমরা যতদূর সম্ভব এটা পালন কর, আর যখন কোন বিষয় থেকে নিষেধ করি, তখন তা পরিত্যাগ কর।" মর্ম এই যে, আমার আনীত শরী‘আতের মেযাজ বা প্রকৃতি কঠোরতা ও সংকীর্ণতা নয়; বরং সহজ ও উদারতা। তাই তোমাদের পক্ষ থেকে যতদূর সম্ভব তোমরা এটা পালন করার চেষ্টা করে যাও। মানবীয় দুর্বলতার কারণে এতে যে ত্রুটি থেকে যাবে, আল্লাহ্ তা'আলার দয়া ও অনুগ্রহের ফলে এর ক্ষমার আশা করা যায়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান