আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৪. অধ্যায়ঃ জানাযা

হাদীস নং: ৫৩৩৭
অধ্যায়ঃ জানাযা
কবর খনন, মৃতকে গোসল দান ও তার কাফনের ব্যবস্থা করার জন্য উৎসাহ প্রদান
৫৩৩৭. হযরত আবু রাফি' (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে কোন মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয় এবং তার গোপন বিষয়াদি লুকিয়ে রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার চল্লিশটি কবীরা গুণাহ মাফ করে দেন। আর যে তার ভাইয়ের জন্য কবর খনন করে, যাতে তাকে দাফন করা যায়, সে যেন পুনরুত্থান পর্যন্ত একটি বাসস্থান তার জন্য আবাসের ব্যবস্থা করল।
(তবারানী (র) 'আল-কাবীর' গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসের সকল বর্ণনাকারী সহীহ হাদীসের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য। হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, হাদীসটি মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। হাকিম বর্ণিত রিওয়ায়েতের পাঠ হলো : "যে কোন মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয় এবং তার গোপন বিষয়াদি লুকিয়ে রাখে, আল্লাহ তা'আলা চল্লিশবার তার গুণাহ মার্জনা করেন, যে কোন মৃত ব্যক্তিকে কাফনের ব্যবস্থা করে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে জান্নাতে সুন্দুস ও ইসতাবরাক নামক রেশমী কাপড় পরিধান করাবেন এবং যে কোন মৃত ব্যক্তির জন্য কবর খনন করে এবং তাকে তাতে দাফন করে আল্লাহ তা'আলা তার জন্য এরূপ পুরস্কারের ঘোষণা দেন, যেন সে তাকে একটি বাসস্থানে কিয়ামত পর্যন্ত আবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
তবারানী 'আল-আওসাত' গ্রন্থে জাবির-এর রিওয়ায়েতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসের সনদে খলীল ইবন মুররা নামক একজন সন্দিগ্ধ রাবী রয়েছেন। তবারানী বর্ণিত রিওয়ায়েতের পাঠ এরূপঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন কবর খনন করে আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ করেন, যে ব্যক্তি কোন মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয় সে তার গুণাহসমূহ থেকে এভাবে বের হয়ে যায় যেমন তাকে তার মাতা প্রসব করার সময় সে নিষ্পাপ ছিল। যে কোন মৃত ব্যক্তির কাফনের ব্যবস্থা করে আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাতের পোষাক পরিধান করান, যে কোন দুঃখিতের প্রতি সমবেদনা জানায় যা তাকে সান্ত্বনা দান করে, আল্লাহ্ তাকে 'তাকওয়া' মণ্ডিত করেন এবং রূহের জগতে তার রূহের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, যে কোন বিপদগ্রস্তের প্রতি সমবেদনা জনায় ও তাকে সান্ত্বনা দান করে আল্লাহ্ তাকে জান্নাতের এমন দু'টি পোষাক পরিধান করান, যার সমমূল্য সমগ্র দুনিয়া হবে না, যে জানাযার অনুগমন করে এবং তার দাফন সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তার সাথে অবস্থান করে আল্লাহ্ তার জন্য তিন কীরাত সাওয়াব লিপিবদ্ধ করেন এবং যে ব্যক্তি কোন প্রতীম অথবা কোন বিধবার তত্ত্বাবধান করে, আল্লাহ্ তাকে তাঁর (আরশের) ছায়াতলে ছায়া দান করবেন এবং তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন।)
كتاب الجنائز
التَّرْغِيب فِي حفر الْقُبُور وتغسيل الْمَوْتَى وتكفينهم
5337- عَن رَافع رَضِي الله عَنهُ قَالَ قَالَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم من غسل مَيتا فكتم عَلَيْهِ غفر الله لَهُ أَرْبَعِينَ كَبِيرَة وَمن حفر لِأَخِيهِ قبرا حَتَّى يجنبه فَكَأَنَّمَا أسْكنهُ مسكنا حَتَّى يبْعَث

رَوَاهُ الطَّبَرَانِيّ فِي الْكَبِير وَرُوَاته مُحْتَج بهم فِي الصَّحِيح وَالْحَاكِم وَقَالَ صَحِيح على شَرط مُسلم وَلَفظه من غسل مَيتا فكتم عَلَيْهِ غفر الله لَهُ أَرْبَعِينَ مرّة وَمن كفن مَيتا كَسَاه الله من سندس وإستبرق فِي الْجنَّة وَمن حفر لمَيت قبرا فأجنه فِيهِ أجْرى الله لَهُ من الْأجر كَأَجر مسكن أسْكنهُ إِلَى يَوْم الْقِيَامَة
وَرَوَاهُ الطَّبَرَانِيّ فِي الْأَوْسَط من حَدِيث جَابر وَفِي سَنَده الْخَلِيل بن مرّة وَلَفظه قَالَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم من حفر قبرا بنى الله لَهُ بَيْتا فِي الْجنَّة وَمن غسل مَيتا خرج من ذنُوبه كَيَوْم وَلدته أمه وَمن كفن مَيتا كَسَاه الله من حلل الْجنَّة وَمن عزى حَزينًا ألبسهُ الله
التَّقْوَى وَصلى على روحه فِي الْأَرْوَاح وَمن عزى مصابا كَسَاه الله حلتين من حلل الْجنَّة لَا تقوم لَهما الدُّنْيَا وَمن تبع جَنَازَة حَتَّى يقْضى دَفنهَا كتب الله لَهُ ثَلَاثَة قراريط القيراط مِنْهَا أعظم من جبل أحد وَمن كفل يَتِيما أَو أرملة أظلهُ الله فِي ظله وَأدْخلهُ الْجنَّة

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা মায়্যিতকে গোসল করায় কিংবা মায়্যিতকে দেখার সুযোগ হয়, তাদের জন্য এটি এক সতর্কবাণীও বটে। কেননা তাদের অনেকে মায়্যিতের শারীরিক দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করে বেড়ায়। মৃত্যুযন্ত্রণায় অনেকের চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায়। বাহ্যত সে দৃশ্য প্রীতিকর হয় না। এ কারণে অনেকে মায়্যিত সম্পর্কে কুধারণাও করে বসে। বাহ্যত যা দেখা যায়, তা দ্বারা যে মায়্যিতের ঈমান, আমলের অবস্থা নির্ণয় করা যায় না, এটা অনেকেই বোঝে না। ধরে নেয় তার ঈমান-আমলের অবস্থা ভালো নয় বলেই চেহারা এরকম হয়েছে। এ সবই ভুল। বান্দার প্রকৃত হাল আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তাই এ জাতীয় বিষয় প্রচার করতে নেই; বরং গোপন রাখাই বাঞ্ছনীয়। হাদীছটিতে সে উৎসাহই দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে-
مَنْ غَسَّلَ ميتا فكتَمَ عَلَيْهِ، غَفَرَ اللَّهُ لَهُ أَرْبَعِينَ مَرَّةً (যে ব্যক্তি কোনও মায়্যিতকে গোসল করায়, তারপর সে তার দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তা'আলা তাকে চল্লিশবার ক্ষমা করেন)। অর্থাৎ একবার একবার করে চল্লিশবার ক্ষমা করেন। প্রত্যেকবার কী পরিমাণ গুনাহ ক্ষমা করেন তা আল্লাহ তা'আলাই জানেন। তিনি সাত্তারুল 'উয়ুব। অতিশয় দোষগোপনকারী। অপর এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
من غَسَّلَ مَيّتًا، فَسَتَرَهُ سَتَرَهُ اللَّهُ مِنَ الذُّنُوبِ
'যে ব্যক্তি কোনও মায়্যিতকে গোসল করায়, তারপর তার দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার পাপরাশি গোপন রাখবেন’। (তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৮০৭৭)

বস্তুত যে ব্যক্তি কারও দোষ জানতে পারে, তার কর্তব্য তা গোপন রাখা। তার জন্য এটা আমানত। এ কথা জীবিত ও মৃত উভয়ের বেলায় প্রযোজ্য। মৃতব্যক্তির ক্ষেত্রে অধিকতর জরুরি। আর দোষ গোপন রাখা যখন আমানত, তখন প্রকাশ করাটা খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত বৈ কি। খেয়ানত করা কঠিন গুনাহ। এজন্যই যে-কারও দ্বারা মায়্যিতকে গোসল না করানোই ভালো। সর্বোত্তম হল মায়্যিতের নিকটজনেরাই তাকে গোসল করাবে। নিকটজনেরা না পারলে এমন কোনও ব্যক্তির উপর এ কাজ অর্পণ করা উচিত, যে একজন পরহেযগার ও আমানতদার লোকরূপে পরিচিত।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. মায়্যিতকে গোসল করানো অনেক বড় ছাওয়াবের কাজ।

খ. যে ব্যক্তি মায়্যিতকে গোসল করায়, তাকে অবশ্যই আমানতদার হতে হবে। মায়্যিতের কোনও খুঁত ও দোষ দেখতে পেলে তা কিছুতেই প্রকাশ করা চলবে না।

গ. পাপ থেকে ক্ষমা পাওয়ার একটা ভালো উপায় মায়্যিতের দোষ-খুঁত গোপন রাখা। তাই এ বিষয়ে আমাদেরকে খুব সচেতন হতে হবে।

ঘ. আল্লাহ তা'আলা বড় ক্ষমাশীল। তিনি অতি সহজ সহজ কাজের অছিলায়ও বান্দার পাপরাশি ক্ষমা করেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান