আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৪. অধ্যায়ঃ জানাযা

হাদীস নং: ৫২৯৯
অধ্যায়ঃ জানাযা
অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান ও তার প্রতি গুরুত্বারোপ এবং অসুস্থ ব্যক্তির দু'আর উৎসাহ প্রদান
৫২৯৯. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি, যে মুসলমানই
কোন মুসলমানকে সকাল বেলায় অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যায়, তার জন্য সত্তর হাজার ফিরিশতা সন্ধ্যা পর্যন্ত দু'আ করেন। আর যদি সন্ধ্যা বেলায় দেখতে যায় সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফিরিশতা তার জন্য দু'আ করেন এবং তার জন্য জান্নাতে রয়েছে তরতাজা খর্জুর।
(তিরমিযী (র) হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, হাদীসটি হাসান গারীব। হাদীসটি আলী (রা) থেকে মাওকুফ
সনদেও বর্ণিত হয়েছে। আবু দাউদ হাদীসটি আলী (রা) থেকে মাওকূফ সনদে বর্ণনা করে বলেন, এ হাদীস
কোন সহীহ্ সনদ ব্যতিরেকে নবী (ﷺ) থেকে মারফুরূপে বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর তিনি এ অর্থবোধক এক রিওয়ায়েত মারফু'রূপে বর্ণনা করেছেন।
মাওকূফ রিওয়ায়েতের পাঠ এরূপ যে কোন মানুষ কোন অসুস্থ ব্যক্তিকে সন্ধ্যা বেলায় দেখতে যায়, তার সাথে সত্তর হাজার ফিরিশতা বের হন, তাঁর জন্য সকাল পর্যন্ত দু'আ করেন এবং তার জন্য জান্নাতে রয়েছে তরতাজা খেজুর। আর যে ব্যক্তি তাকে সকাল বেলায় দেখতে যায়, তার সাথে সত্তর হাজার ফিরিশতা বের হন তাঁরা তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত দু'আ করেন এবং তার জন্য রয়েছে জান্নাতে তরতাজা খেজুর।
আহমাদ ও ইবন মাজাহ (র) অনুরূপভাবে মারফু'রূপে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইবন মাজাহ (র) তার শুরুতে এ অংশটুকু বেশি উল্লেখ করেছেন: "যখন কোন মুসলমান তার আবার ভাইকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যায়, তখন সে বসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল চয়নের মধ্যে বিচরণ করে। যখন সে বসে তখন রহমত তাকে ঢেকে নেয়। আল-হাদীস। তবে আহমাদ ও ইবন মাজার রিওয়ায়েতে "তার জন্য জান্নাতে রয়েছে তরতাজা খেজুর।" অংশটুকু নেই। ইবন হিব্বান তাঁর 'সহীহ্' কিতাবে ও মারফু রূপে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত রিওয়ায়েতের পাঠ এরূপঃ "যে কোন মুসলমানই কোন মুসলমানকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যায়, আল্লাহ্ তা'আলা তার কাছে সত্তর হাজার ফিরিশতা প্রেরণ করেন। তাঁরা সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত সারাদিন এবং সকাল হওয়া পর্যন্ত সারা রাত্রি তার জন্য দু'আ করেন। হাকিম তিরমিযীর মতই মারফুরূপে হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ।
অর্থাৎ সে, ফল চয়নের সময় এসেছে। এখানে অসুস্থ লোককে দেখতে যাওয়া ব্যক্তির সাওয়াব লাভকে ফল চয়নের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ইব্‌ন আনবারী এরূপ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।)
كتاب الجنائز
التَّرْغِيب فِي عِيَادَة المرضى وتأكيدها وَالتَّرْغِيب فِي دُعَاء الْمَرِيض
5299- وَعَن عَليّ رَضِي الله عَنهُ قَالَ سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول مَا من مُسلم يعود مُسلما غدْوَة إِلَّا صلى عَلَيْهِ سَبْعُونَ ألف ملك حَتَّى يُمْسِي وَإِن عَاد عَشِيَّة إِلَّا صلى عَلَيْهِ سَبْعُونَ ألف ملك حَتَّى يصبح وَكَانَ لَهُ خريف فِي الْجنَّة

رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَقَالَ حَدِيث حسن غَرِيب وَقد رُوِيَ عَن عَليّ مَوْقُوفا انْتهى وَرَوَاهُ أَبُو دَاوُد مَوْقُوفا على عَليّ ثمَّ قَالَ وَأسْندَ هَذَا عَن عَليّ من غير وَجه صَحِيح عَن النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم ثمَّ رَوَاهُ مُسْندًا بِمَعْنَاهُ
وَلَفظ الْمَوْقُوف مَا من رجل يعود مَرِيضا ممسيا إِلَّا خرج مَعَه سَبْعُونَ
ألف ملك يَسْتَغْفِرُونَ لَهُ حَتَّى يصبح وَكَانَ لَهُ خريف فِي الْجنَّة وَمن أَتَاهُ مصبحا خرج مَعَه سَبْعُونَ ألف ملك يَسْتَغْفِرُونَ لَهُ حَتَّى يُمْسِي وَكَانَ لَهُ خريف فِي الْجنَّة
وَرَوَاهُ بِنَحْوِ هَذَا أَحْمد وَابْن مَاجَه مَرْفُوعا
وَزَاد فِي أَوله إِذا عَاد الْمُسلم أَخَاهُ مَشى فِي خرافة الْجنَّة حَتَّى يجلس فَإِذا جلس غمرته الرَّحْمَة
الحَدِيث وَلَيْسَ عِنْدهمَا وَكَانَ لَهُ خريف فِي الْجنَّة
رَوَاهُ ابْن حبَان فِي صَحِيحه مَرْفُوعا أَيْضا وَلَفظه مَا من مُسلم يعود مُسلما إِلَّا يبْعَث الله إِلَيْهِ سبعين ألف ملك يصلونَ عَلَيْهِ فِي أَي سَاعَات النَّهَار حَتَّى يُمْسِي وَفِي أَي سَاعَات اللَّيْل حَتَّى يصبح
رَوَاهُ الْحَاكِم مَرْفُوعا بِنَحْوِ التِّرْمِذِيّ وَقَالَ صَحِيح على شَرطهمَا
قَوْله فِي خرافة الْجنَّة بِكَسْر الْخَاء أَي فِي اجتناء ثَمَر الْجنَّة
يُقَال خرفت النَّخْلَة أخرفها فَشبه مَا يحوزه عَائِد الْمَرِيض من الثَّوَاب بِمَا يحوزه المخترف من الثَّمر
هَذَا قَول ابْن الْأَنْبَارِي

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছটিতে রোগী দেখতে যাওয়ার বিশাল ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। হাদীছটি বর্ণনা করেছেন হযরত আলী রাযি.। বর্ণনাটির একটি প্রেক্ষাপট আছে। একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাতি হযরত হাসান রাযি. অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। খবর পেয়ে হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি. তাঁকে দেখতে গেলেন। হযরত আলী রাযি. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি রোগী দেখতে এসেছেন, না আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে? তিনি বললেন, না, বরং রোগী দেখতে। তখন হযরত আলী রাযি. তাঁকে এ হাদীছটি শুনিয়ে দেন।

হাদীছটিতে রোগী দেখতে যাওয়ার দু'টি ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। তার একটি হল সত্তর হাজার ফিরিশতার দু'আ পাওয়া। যে ব্যক্তি সকালবেলা কোনও রোগীকে দেখতে যায়, তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফিরিশতা দু'আ করতে থাকে। আর সন্ধ্যাবেলা দেখতে গেলে সকালবেলা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফিরিশতা তার জন্য দু'আ করতে থাকে।

কোনও কোনও বর্ণনায় আরও আছে যে, ফিরিশতাগণ আল্লাহর কাছে তার গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। নিশ্চয়ই মা'সুম ফিরিশতাদের দু'আ বৃথা যায় না। কাজেই যারা রোগী দেখতে যায়, যথেষ্ট আশা রয়েছে আল্লাহ পাপরাশিও ক্ষমা করে দেবেন।

এতসংখ্যক ফিরিশতাদের দু'আ করতে থাকায় আশ্চর্যের কিছু নেই। দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষও যদি সকাল-বিকাল রোগী দেখতে বের হয়, তবে আল্লাহর এতসংখ্যক ফিরিশতা আছে যে, তাদের প্রত্যেকের জন্যই সত্তর হাজার ফিরিশতা দু'আ করতে পারবে। তাতে ফিরিশতাদের সংখ্যায় কোনও টান পড়বে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ
'তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে (অর্থাৎ তাদের সংখ্যা যে কত তা) তিনি ছাড়া কেউ জানে না’। (সূরা মুদ্দাচ্ছির, আয়াত ৩১)

বলাবাহুল্য, ফিরিশতাদের দু'আ পেতে পারে কেবল তারাই, যারা ঈমানদার এবং যারা কেবল আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্যই রোগী দেখতে যায়। ইখলাস ও সহীহ নিয়ত যে-কোনও নেক আমলের জন্যই জরুরি।

রোগী দেখতে যাওয়ার দ্বিতীয় ফযীলত হল জান্নাতের ফল লাভ করা। অর্থাৎ রোগী দেখতে যাওয়ার পুরস্কারে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের অকল্পনীয় স্বাদের ফল খাওয়াবেন। জান্নাতের ফল খাওয়া যাবে জান্নাতে গেলেই। কাজেই এটা কেবল ফল খেতে পারার সুসংবাদই নয়; বরং জান্নাত পাওয়ারও সুসংবাদ। আল্লাহু আকবার! অতি সহজ ও সামান্য কাজের বিনিময়েও মহা মেহেরবান আল্লাহ কী বিশাল পুরস্কারের ব্যবস্থা রেখেছেন। কিন্তু মানুষ কতইনা গাফেল। এত বড় ফযীলতের এ আমলটি ক'জন মানুষই বা করে? অতি কাছে বা অতি আপনজন দিনের পর দিন রোগশয্যায় শায়িত থাকে। তা সত্ত্বেও তাকে দেখতে যাওয়ার ফুরসত হয় না! হয় না ইচ্ছাও। আল্লাহ তা'আলা এ গাফলাত থেকে জেগে ওঠার তাওফীক আমাদেরকে দান করুন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. রোগী দেখতে গেলে ফিরিশতাদের দু'আ পাওয়া যায়।

খ. রোগী দেখতে যাওয়ার দ্বারা গুনাহ মাফেরও আশা থাকে।

গ. আল্লাহ তা'আলার ফিরিশতাসংখ্যা অগণিত। বিভিন্ন কাজের জন্য তাদের নিযুক্ত রাখা হয়েছে। একেক কাজের জন্য অসংখ্য ফিরিশতা।

ঘ. রোগী দেখতে যাওয়ার দ্বারা জান্নাতলাভ সহজ হবে এবং জান্নাতের ফল ভোগ করা যাবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান