আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৪. অধ্যায়ঃ জানাযা

হাদীস নং: ৫২৭২
অধ্যায়ঃ জানাযা
মাদুলি ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্কীকরণ
৫২৭২. হযরত আব্দুল্লাহ (ইবন মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী যায়নাবের ভাগিনের সূত্রে যায়নাব (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন বৃদ্ধা মহিলা আমাদের কাছে আসত, সে রক্তিম ফোসকার ঝাঁড় ফুক করত। আমাদের উঁচু পায়া বিশিষ্ট একটি খাট ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন জোরে কাশি দিতেন। একদিন তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন। যখন বৃদ্ধা মহিলাটি তাঁর শব্দ শুনল তখন তাঁর সৃষ্টি থেকে নিজেকে গোপন করল। তিনি এলেন এবং আমার কাছে বসে আমাকে স্পর্শ করলেন। তখন তিনি একটি তাগার ছোঁয়া অনুভব করলেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি? আমি বললাম, এতে আমার রক্তিম ফোসকার জন্য ঝাঁড়ফুক দেওয়া হয়েছে। একথা শুনে তিনি তাগাটি টেনে নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন এবং তা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। এরপর বললেন, আব্দুল্লাহর পরিবার পরিজন শিরকের ঊর্ধ্বে। আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয় ঝাঁড়ফুক, মাদুলি ও যাদু-টোনা শিরক। আমি বললাম, আমি একদিন বাইরে গিয়েছি। তখন আমাকে অমুক লোক দেখেছে। ফলে আমার সে চক্ষুটি থেকে পানি ঝরতে শুরু করেছে, যেটি তার দিকে ছিল। তারপর যখন আমি চক্ষুটি ঝাড়লাম তখন তার পানি পড়া বন্ধ হয়ে গেল। আবার যখন ঝাড়ানো ছেড়ে দিলাম তখন আবার পানি করতে শুরু করল। তিনি বললেন, এটা হচ্ছে শয়তান। যখন তুমি তার আনুগত্য করলে তখন সে তোমাকে ছেড়ে দিল। আর যখন তুমি তার বিরুদ্ধাচরণ করলে তখন সে তোমার চোখে তার অঙ্গুলি ঠেসে দিল। তবে তুমি যদি তা-ই করতে, যা রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) করেছেন, তবে তা তোমার জন্য অধিক কল্যাণকর এবং তোমার চক্ষু রোগমুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর হত। তুমি তোমার চোখে পানি ছিটে দাও এবং বলঃ
أذْهِبِ البَاسَ رَبَّ النَّاسِ، اشْفِ وأَنْتَ الشَّافِي، لا شِفَاءَ إلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لا يُغَادِرُ سَقَمًا
‘‘ব্যথার উপশম করে দাও হে মানুষের প্রতিপালক, নিরাময় দাও, কেননা তুমি নিরাময়কারী এবং তোমার নিরাময় ব্যতীত নিরাময় নেই- এমন নিরাময় যা' কোন ব্যাধিকে ছেড়ে দেয় না’’।
(ইবন মাজাহ (র) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির উল্লিখিত ভাষা তাঁরই বর্ণিত। আবু দাউদ সংক্ষিপ্তাকারে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, হাদীসটি যায়নাবের ভ্রাতৃপুত্র থেকে বর্ণিত। ইবন মাজার কোন কোন কপিতেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। উভয় বর্ণনা মতে, লোকটির নাম অজ্ঞাত। হাকিম তাঁদের উভয়ের চেয়ে সংক্ষিপ্তাকারে হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, এর সনদ সহীহ। আবু সুলায়মান খাত্তাবী বলেন, নিষিদ্ধ ঝাড়ফুক দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন ঝাড়ফুক যা অনারবীয় ভাষায় করা হয় এবং যার অর্থ বোধগম্য নয়। কেননা, হয়ত তাতে যাদু অথবা কুফরী (কালাম) রয়েছে। কিন্তু যে ঝাড় ফুঁকের অর্থ বোধগম্য এবং তাতে আল্লাহ তা'আলার যিকির থাকে তা মুস্তাহাব ও বরকতময়। আল্লাহই সর্বধিক জ্ঞাত।)
كتاب الجنائز
التَّرْهِيب من تَعْلِيق التمائم والحروز
5272- وَعَن ابْن أُخْت زَيْنَب امْرَأَة عبد الله عَن زَيْنَب رَضِي الله عَنْهَا قَالَت كَانَت عَجُوز تدخل علينا ترقي من الْحمرَة وَكَانَ لنا سَرِير طَوِيل القوائم وَكَانَ عبد الله إِذا دخل تنحنح
وَصَوت فَدخل يَوْمًا فَلَمَّا سَمِعت صَوته احْتَجَبت مِنْهُ فجَاء فَجَلَسَ إِلَى جَانِبي فمسني فَوجدَ مس خيط فَقَالَ مَا هَذَا فَقلت رقي لي فِيهِ من الْحمرَة فَجَذَبَهُ فَقَطعه فَرمى بِهِ ثمَّ قَالَ لقد أصبح آل عبد الله أَغْنِيَاء عَن الشّرك سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول إِن الرقى والتمائم والتولة شرك
قلت فَإِنِّي خرجت يَوْمًا فأبصرني فلَان فَدَمَعَتْ عَيْني الَّتِي تليه فَإِذا رقيتها سكنت دمعتها وَإِذا تركتهَا دَمَعَتْ قَالَ ذَلِك الشَّيْطَان إِذا أطعته تَركك وَإِذا عصيته طعن بِأُصْبُعِهِ فِي عَيْنك وَلَكِن لَو فعلت كَمَا فعل رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم كَانَ خيرا لَك وأجدر أَن تشفي تنضحي فِي عَيْنك المَاء وتقولي أذهب الْبَأْس رب النَّاس واشف أَنْت الشافي لَا شِفَاء إِلَّا شفاؤك شِفَاء لَا يُغَادر سقما

رَوَاهُ ابْن مَاجَه وَاللَّفْظ لَهُ وَأَبُو دَاوُد بِاخْتِصَار عَنهُ إِلَّا أَنه قَالَ عَن ابْن أخي زَيْنَب وَهُوَ كَذَا فِي بعض نسخ ابْن مَاجَه وَهُوَ على كلا التَّقْدِير مَجْهُول وَرَوَاهُ الْحَاكِم أخصر مِنْهُمَا وَقَالَ صَحِيح الْإِسْنَاد قَالَ أَبُو سُلَيْمَان الْخطابِيّ الْمنْهِي عَنهُ من الرقى مَا كَانَ بِغَيْر لِسَان الْعَرَب فَلَا يدرى مَا هُوَ وَلَعَلَّه قد يدْخلهُ سحر أَو كفر فَأَما إِذا كَانَ مَفْهُوم الْمَعْنى وَكَانَ فِيهِ ذكر الله تَعَالَى فَإِنَّهُ مُسْتَحبّ متبرك بِهِ وَالله أعلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়ে তার শরীরে হাত বোলাতেন এবং হাদীছে বর্ণিত দু'আটি পাঠ করতেন। একই দু'আ বিভিন্ন হাদীছে সামান্য শাব্দিক পার্থক্যের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। অর্থের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই। কাজেই দু'আটি যে-কোনও বর্ণনা অনুসারেই পড়া যেতে পারে।

বলাবাহুল্য রোগীর গায়ে হাত বোলানোর ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম রক্ষা করা চাই। যেমন নিজ হাত পরিষ্কার থাকা, রোগীর যাতে কষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা এবং অভিজ্ঞ ও দীনদার চিকিৎসকের নিষেধ না থাকা।

দু'আটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ। এতে প্রথমেই আল্লাহ তা'আলাকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে- اَللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ (মানুষের প্রতিপালক হে আল্লাহ)! অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনিই মানুষের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা। আপনি আপনার সৃষ্টির যথাযথ প্রতিপালন করে থাকেন। যাবতীয় ক্ষতিকর বিষয় থেকে তাকে আপনিই রক্ষা করতে পারেন ও রক্ষা করেও থাকেন। আপনি ছাড়া আর কোনও রক্ষাকর্তা নেই। তাই আপনার এ বান্দার বিপদে আপনারই আশ্রয় গ্রহণ করছি। সে যে কষ্ট ও ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে, তাকে তা থেকে মুক্ত কেবল আপনিই করতে পারেন। সুতরাং-
أَذْهِبَ الْبَأْسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي (কষ্ট দূর করুন। আরোগ্য দিন। আপনিই আরোগ্যদাতা)। অর্থাৎ আরোগ্যদান করা আপনারই কাজ। এটা যেহেতু আপনারই কাজ, তাই আমরা এর জন্য আপনারই শরণাপন্ন হচ্ছি। বস্তুত এটাই নিয়ম। রোগ-ব্যাধি হলে প্রধান কাজ আল্লাহ তা'আলার শরণাপন্ন হওয়া। চিকিৎসা করানো নিষেধ নয়। বাহ্যিক উপায়-উপকরণ যা-কিছুই অবলম্বন করা সম্ভব তা অবশ্যই করবে। কিন্তু মূল ভরসাটা থাকবে আল্লাহর উপরই। কারণ উপায়-উপকরণ নিজে নিজে কিছু করতে পারে না। আল্লাহ তা'আলাই তা দ্বারা উপকার সাধন করেন। তাই তো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর কওমকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন-
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ
'এবং আমি যখন পীড়িত হই, তিনিই আমাকে শিফা দান করেন’। (সূরা শু'আরা, আয়াত ৮০)

হযরত আয়্যুব আলাইহিস সালাম তাঁর অসুস্থ অবস্থায় আল্লাহ তা’আলারই শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কুরআন মাজীদে তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে-
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ . فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍّ
'এবং আয়্যুবকে দেখো, যখন সে নিজ প্রতিপালককে ডেকে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার এই কষ্ট দেখা দিয়েছে এবং তুমি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। আমি তার দু'আ কবুল করলাম এবং সে যে কষ্টে আক্রান্ত ছিল তা দূর করে দিলাম।’ -(সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৮৩, ৮৪)

সকল নবী-রাসূলের শ্রেষ্ঠ আমাদের নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ হাদীছটির মাধ্যমে আমাদেরকে সেই শিক্ষাই দান করেছেন। দু'আটির ভেতর তিনি বলেন-
لا شفاء إلا شفاؤك (আপনার আরোগ্যদান ছাড়া কোনও আরোগ্য নেই)। অর্থাৎ আপনি আরোগ্য না দিলে অন্য কেউ আরোগ্য দিতে পারে না। আপনি কাউকে রোগমুক্ত না করলে সে কোনও উপায়ে রোগমুক্তি লাভ করতে পারে না। তাই আমরা আপনারই কাছে রোগমুক্তি কামনা করি। আপনি এই রোগীকে নিরাময় দান করুন।

شفاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا (এমন আরোগ্য দান করুন, যা কোনও রোগ অবশিষ্ট রাখবে না)। অর্থাৎ তার যে রোগ প্রকাশ পেয়েছে তা থেকেও তাকে নিরাময় দিন এবং যে রোগ প্রকাশ পায়নি কিন্তু ভেতরে ভেতরে আছে তা থেকেও। এমনিভাবে তাকে ওইসকল রোগ থেকেও মুক্তিদান করুন, যা বর্তমান রোগ থেকে মুক্তিলাভের পর তার উপসর্গস্বরূপ থেকে যেতে পারে। তাকে এমনভাবে নিরাময় দান করুন, যাতে এ রোগের কোনও প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও আভাসমাত্র অবশিষ্ট না থাকে।

প্রকাশ থাকে যে, দু'আটির অর্থ নিজ ভাষায় উচ্চারণ করলেও সুফল পাওয়ার আশা আছে। তবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো ভাষার স্বতন্ত্র তাৎপর্য ও বরকত রয়েছে। তাই দু'আটি হুবহু তাঁর ভাষায় পড়াই শ্রেয়।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কারও অসুস্থতার সংবাদ পেলে তাকে দেখতে যাওয়া উচিত।

খ. রোগীর শরীরে হাত রেখে হাদীছে বর্ণিত দু'আটি পাঠ করলে সুন্নতের উপর আমল হবে এবং এর দ্বারা উপশমের আশা রাখা যায়।

গ. যে-কোনও চিকিৎসায় বিশ্বাস রাখা জরুরি যে, আরোগ্যদাতা কেবল আল্লাহ তা'আলাই। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কোনও ব্যবস্থা কোনও কাজে আসে না। ওষুধ, পথ্য ইত্যাদির নিজস্ব কোনও ক্ষমতা নেই। এসবের সুফল কেবল তাঁর ইচ্ছারই প্রতিফলন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান