আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২২. অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার

হাদীস নং: ৪৪৩৩
অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার
বিনয়ী হওয়ার প্রতি অনুপ্রেরণা এবং অহংকার ও আত্ম প্রশংসায় পঞ্চমুখ এবং আত্মম্ভরিতার প্রতি ভীতি প্রদর্শন
৪৪৩৩. হযরত হুযায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন একদা আমরা নবী (ﷺ)-এর সাথে এক জানাযায় অংশগ্রহণ করি। এসময় তিনি বলেনঃ আমি কি আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দা সম্পর্কে তোমাদের অবহিত করব? তারা হল: কথায় ও চাল-চলনে যারা অহংকারের আশ্রয় নেয়। আমি কি তোমাদের আল্লাহর উত্তম বান্দাদের ব্যাপারে অবহিত করব না? তারা হল: নিতান্ত দুর্বল এবং ছিন্ন বস্ত্রপরিধানকারী (মানুষের কাছে যার কোন মর্যাদা নেই)। কেউ তাকে মূল্যায়ন করে না, অথচ যদি সে আল্লাহর নামে শপথ করে কিছু বলে, তিনি তা বাস্তবায়ন করেন।
(আহমাদ বর্ণিত। তবে মুহাম্মদ ইব্‌ন জাবির ব্যতীত সূত্রের বর্ণনাকারীদের বর্ণনা বিশুদ্ধ।)
كتاب الأدب
التَّرْغِيب فِي التَّوَاضُع والترهيب من الْكبر وَالْعجب والافتخار
4433- وَعَن حُذَيْفَة رَضِي الله عَنهُ قَالَ كُنَّا مَعَ النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فِي جَنَازَة قَالَ أَلا أخْبركُم بشر عباد الله الْفظ المستكبر أَلا أخْبركُم بِخَير عباد الله الضَّعِيف المستضعف ذُو الطمرين لَا يؤبه لَهُ لَو أقسم على الله لَأَبَره

رَوَاهُ أَحْمد وَرُوَاته رُوَاة الصَّحِيح إِلَّا مُحَمَّد بن جَابر

হাদীসের ব্যাখ্যা:

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে প্রশ্ন করেন যে, আমি কি তোমাদেরকে অবহিত করব না আল্লাহর উৎকৃষ্ট বান্দা সম্পর্কে? (তারা হচ্ছে দুর্বল ও দুর্বলরূপে পরিগণিত, জীর্ণবস্ত্রধারী ব্যক্তি, যার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় না। যদি সে আল্লাহর নামে কসম করে বসে, তবে আল্লাহ তাকে কসম থেকে মুক্ত করে দেন। (অর্থাৎ তার কসম পূর্ণ করে দেন)। এখানে পাশাপাশি ضعيف ও المستضعف এ দু'টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। উভয়টির মূলধাতু ضعف , অর্থ দুর্বলতা। ضعيف বলা হয় ওই দুর্বল ব্যক্তিকে, যার পার্থিব আসবাব উপকরণ খুব কম এবং চারিত্রিক দিক থেকে বিনয়ী।
المستضعف দ্বারা এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, লোকে দুনিয়াবী অবস্থার দুর্বলতাহেতু যাকে দুর্বল ও তুচ্ছ গণ্য করে এবং তার উপর নিজেদের বড়ত্ব প্রকাশ করে।
সারকথা এ শব্দদু'টি দ্বারা এমন গরীব দীনদারকে বোঝানো হয়, যে নির্মোহ, বিনয়নম্র, প্রচারবিমুখ ও অতি সাধারণ জীবনযাপনকারী। বাক্যের পরবর্তী অংশটি প্রথম অংশের বিশেষণ, যা দ্বারা আল্লাহ তাআলার কাছে এ শ্রেণীর লোকদের মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। বলা হচ্ছে- لو أقسم على الله لأبره (যে আল্লাহর নামে শপথ করলে আল্লাহ অবশ্যই তার শপথ রক্ষা করেন)। অর্থাৎ তার শপথের মর্যাদা রক্ষার্থে সে যে উদ্দেশ্যে শপথ করেছে, আল্লাহ তাআলা তা পূর্ণ করেন। এ ব্যাপারে হযরত আনাস ইবনুন নাযর রাযি. ও তাঁর বোন রুবায়্যি রাযি.-এর ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
হযরত রুবায়্যি রাযি.-এর সঙ্গে একবার এক মহিলার কলহ দেখা দেয়। তাতে হযরত রুবায়্যি রাযি.-এর এক আঘাতে সে মহিলার একটি দাঁত ভেঙে যায়। তাঁর পক্ষের লোকজন সে মহিলার পক্ষের লোকজনকে অনুরোধ জানাল যেন তারা ক্ষমা করে দেয়। তারা ক্ষমা করতে রাজি হল না। তারপর অনুরোধ জানাল, তাহলে তোমরা এর অর্থমূল্য নিয়ে নাও। তাতেও রাজি হল না। তাদের এক দাবি- দাঁতের বদলে দাঁত, আমরা রুবায়্যিরও একটা দাঁত ভেঙ্গে দেব।
শেষপর্যন্ত বিচার আসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদালতে। তিনি রায় দিলেন- রুবায়্যিরও দাঁত ভেঙ্গে দেওয়া হবে। এ রায় শুনে হযরত আনাস ইবনুন নাযর রাযি. বলে উঠলেন- রুবায়্যির দাঁত ভেঙ্গে ফেলা হবে? ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওই আল্লাহর কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! রুবায়্যির দাঁত ভাঙ্গা হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কী বলছ হে আনাস, এটা তো আল্লাহর বিধান, কিসাস গ্রহণ তাঁর কিতাবের ফয়সালা? কিন্তু তাঁর একই কথা- তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না। এটা কুরআনের বিধান ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফয়সালা অমান্য করা নয়; বরং আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ তাআলা কোনও সহজ সুরত পয়দা করে দেবেন। সে কারণেই তিনি কসম করে বলছিলেন- তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না। আল্লাহ তাআলা তাঁর কসমের মর্যাদা রাখলেন। অপরপক্ষ কিসাস গ্রহণের দাবি ত্যাগ করল এবং অর্থদণ্ড গ্রহণে রাজি হয়ে গেল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকস্মিক পরিবর্তনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তারপর তিনি মন্তব্য করলেন-

إن من عباد الله من لو أقسم على الله لأبره

"আল্লাহর এমন কোনও কোনও বান্দাও আছে, যে আল্লাহর নামে কসম করলে আল্লাহ তা পূর্ণ করেন।

আল্লাহর নিকৃষ্টতম বান্দার বৈশিষ্ট্য

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকৃষ্টতম বান্দার পরিচয় দান করেন- (তারা হচ্ছে রূঢ়, অহংকারী ব্যক্তি)। বলা হয়েছে যে, তারা অহংকারী। অহংকার অত্যন্ত নিন্দনীয় স্বভাব। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন لا يدخل الجنة من كان في قلبه مثقال ذرة من كبر ‘যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।২৪৪
প্রশ্ন হচ্ছে, অহংকার কী? অনেকে সুন্দর পোশাক পরা, ভালো খাওয়া-দাওয়া করা ও পরিপাটি চলাফেরাকে অহংকার মনে করে থাকে। এ ধারণা ঠিক নয়। জীবনমাণে আপন সামর্থ্যের প্রকাশ দূষণীয় নয়; বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা কাম্যও। আল্লাহ তাআলা যাকে যে সামর্থ্য দান করেছেন, কাজকর্মে তা প্রকাশ করা শোকরেরও অন্তর্ভুক্ত। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন إن الله يحب أن يرى أثر نعمته على عبده “আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার উপর নিজ নিআমতের প্রকাশ দেখতে পসন্দ করেন।
চালচলন ও বেশভূষায় সামর্থ্যের প্রকাশ দোষের হয় তখনই, যখন তুলনামূলক কম সামর্থ্যবানকে হেয়জ্ঞান করা হয়। সেটা অহংকারের মধ্যে পড়ে। সুতরাং উল্লিখিত হাদীছটি শুনে এক সাহাবী বলেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোনও কোনও মানুষ এমন আছে, যে ভালো জামা-জুতা পসন্দ করে, সুন্দর হয়ে চলাটা তার প্রিয়। এর উত্তরে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পসন্দ করেন। অর্থাৎ তুমি যা বলছ তা অহংকার নয়। তারপর তিনি অহংকারের সংজ্ঞা দান করলেন যে الكبر بطر الحق وغمط الناس ‘অহংকার হচ্ছে সত্য প্রত্যাখ্যান করা ও মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।
এর দ্বারা অহংকার কী তা বোঝা গেল। সুতরাং কোনও বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে মতভিন্নতা দেখা দিলে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা চাই কার মত সত্য ও সঠিক। যদি স্পষ্ট হয়ে যায় প্রতিপক্ষের মত সঠিক, তবে সে যে-ই হোক না কেন তা মেনে নেওয়া চাই। সে গরীব, শিক্ষা-দীক্ষায় কম বা সামাজিক অবস্থান নিচে, সে তুলনায় আমি উপরে, এ জাতীয় চিন্তাভাবনার কারণে যদি তার মত মেনে নিতে কুণ্ঠাবোধ হয়, তবে নিঃসন্দেহে তা অহংকার। এমনিভাবে কাউকে কোনওদিক থেকে নিজের চেয়ে কম মনে হলে সে কারণে তাকে তুচ্ছ করা হলে তা অহংকার বটে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. মুমিনদের চেষ্টা করা উচিত অন্তরে কঠোরতার পরিবর্তে নম্রতা ও দয়ামায়া সৃষ্টির চেষ্টা করা।

খ. ভোগ-বিলাসিতা পরিহার করে যথাসম্ভব যুহৃদ ও সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া চাই।

গ. চলাফেরায় দর্পিতভঙ্গি অত্যন্ত নিন্দনীয়। চলাফেরায় বিনয়ভঙ্গি বজায় রাখাই প্রকৃত মুমিনের শান।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব - হাদীস নং ৪৪৩৩ | মুসলিম বাংলা