কিতাবুস সুনান - ইমাম আবু দাউদ রহঃ
৫. হজ্ব আদায়ের নিয়মাবলীর বিবরণ
হাদীস নং: ১৭২৪
আন্তর্জাতিক নং: ১৭২৪
হজ্ব আদায়ের নিয়মাবলীর বিবরণ
২. মহিলাদের সাথে মুহরিম পুরুষ ছাড়া হজ্জে যাওয়া।
১৭২৪. আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসলামা ...... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। নবী করীম (ﷺ) বলেন, যে মহিলা আল্লাহ্ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে তার জন্য একদিন ও একরাত সফর করা বৈধ নয় ......... পূর্বোক্ত হাদীসের অনুরূপ বিষয়বস্তু বর্ণিত হয়েছে।
كتاب المناسك
باب فِي الْمَرْأَةِ تَحُجُّ بِغَيْرِ مَحْرَمٍ
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، وَالنُّفَيْلِيُّ، عَنْ مَالِكٍ، ح وَحَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ، حَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ عُمَرَ، حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي سَعِيدٍ، - قَالَ الْحَسَنُ فِي حَدِيثِهِ عَنْ أَبِيهِ، ثُمَّ اتَّفَقُوا - عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " لاَ يَحِلُّ لاِمْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ يَوْمًا وَلَيْلَةً " . فَذَكَرَ مَعْنَاهُ ، قَالَ أَبُو دَاوُدَ: وَلَمْ يَذْكُرِ الْقَعْنَبِيُّ، وَالنُّفَيْلِيُّ، عَنْ أَبِيهِ، رَوَاهُ ابْنُ وَهْبٍ، وَعُثْمَانُ بْنُ عُمَرَ، عَنْ مَالِكٍ، كَمَا قَالَ الْقَعْنَبِيُّ،
হাদীসের ব্যাখ্যা:
ইসলামে নারীর ইজ্জত-সম্মানের মর্যাদা অপরিসীম। তার ইজ্জত-সম্মানে যাতে কোনওভাবেই আঘাত না লাগে, সে বিষয়ে ইসলাম বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কেউ যাতে তার সম্ভ্রমহানির সুযোগ না পায়, সেজন্যও রয়েছে অবশ্যপালনীয় বিধান। এমনকি ইসলাম মিথ্যা অভিযোগ-অপবাদের কলঙ্ক থেকেও নারীকে সুরক্ষা প্রদান করেছে। সে সুরক্ষারই একটা অংশ হলো সফর ও ভ্রমণে স্বামী বা কোনও মাহরাম পুরুষকে তার সঙ্গী হওয়ার বিধান রাখা। নারী একা একা সফর করলে তার সম্ভ্রমের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যানবাহনে কোনও পুরুষ সহযাত্রী তাকে উত্যক্ত করতে পারে। চলতি পথে কোনও দুর্বৃত্তকারী তার পিছু নিতে পারে। তাছাড়া ঘটাতে পারে কোনও দুর্ঘটনাও। সে ক্ষেত্রে তাকে ধরার জন্য বা তার সেবাযত্ন করার জন্য পুরুষের প্রয়োজন তো থাকেই। অপরিচিত অচেনা স্থানে মাহরাম পুরুষের প্রয়োজনীয়তা কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। তাই ইসলাম বাধ্যতামূলক বিধান দিয়েছে যে, নারী সফরে গেলে অবশ্যই কোনও মাহরাম পুরুষ তার সঙ্গে থাকতে হবে। আলোচ্য হাদীছ বলছে, আল্লাহ ও শেষদিবসের প্রতি ঈমান রাখে এমন কোনও নারীর জন্য তার কোনও মাহরাম পুরুষ ব্যতীত একদিন ও এক রাতের দূরত্বে সফর করা জায়েয নয়। এর দ্বারা কয়েকটি বিষয় বোঝা যাচ্ছে।
প্রথম কথা হলো সফরকালে নারীর জন্য মাহরাম পুরুষ সঙ্গে রাখা ঈমানের দাবি। আর তা না রাখাটা ঈমানের পরিপন্থী। বিধানটি আল্লাহপ্রদত্ত। তাই আল্লাহর প্রতি যার ঈমান আছে তার কর্তব্য তাঁর দেওয়া বিধান মেনে চলা। যদি তা না মানে, তবে আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আখিরাতের প্রতি যার ঈমান আছে, তার অবশ্যই সে ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টাও থাকবে। তাই আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নারীকে সতর্ক করা হয়েছে সে যেন মাহরাম পুরুষ ছাড়া কিছুতেই সফর না করে।
দ্বিতীয় কথা হলো সফরে নারী তার সঙ্গে যে পুরুষকে নেবে, তাকে অবশ্যই মাহরাম হতে হবে। গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষকে সঙ্গে নেওয়া বা পরপুরুষের সঙ্গে যাওয়া কিছুতেই জায়েয হবে না। এরূপ করাটাও ঈমানের দাবির পরিপন্থী। গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষের সঙ্গে তো বাড়িতেও একত্রে অবস্থান করা এবং বিনা প্রয়োজনে কথা বলা জায়েয হয় না। অথচ সফরের তুলনায় বাড়িতে যথেষ্ট নিরাপত্তা থাকে। এ অবস্থায় পরপুরুষের সঙ্গে সফরে যাওয়া কীভাবে বৈধ হতে পারে? বরং তা অধিকতর গর্হিত ও নাজায়েয হবে, যদিও প্রশাসনিক বা আইনগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে।
তৃতীয় কথা হলো একাকী বা পরপুরুষের সঙ্গে যাতায়াত নিষেধ করা হয়েছে সফরের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ যতটুকু দূরত্বে গেলে সে গমনকে সফর নামে অভিহিত করা যায়, সে পরিমাণ দূরত্বের বেলায়ই এ বিধান। এর কম দূরত্বে গেলে মাহরাম পুরুষ সঙ্গে থাকা জরুরি নয়। আলোচ্য হাদীছে সে দূরত্বের পরিমাণ বলা হয়েছে একদিন এক রাতের পথ। অর্থাৎ পায়ে হেঁটে বা উটের পিঠে একদিন এক রাত চললে যতদূর যাওয়া যায়, সেটাই হলো একদিন এক রাতের পথ, যদিও গাড়ি-ঘোড়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই সে পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করা যায়।
প্রকাশ থাকে যে, দূরত্বের পরিমাণ সম্পর্কে হাদীছের বর্ণনা বিভিন্ন রকম। আলোচ্য হাদীছে বলা হয়েছে একদিন এক রাতের পথ। কোনও কোনও হাদীছে তিন দিন তিন রাতের কথাও আছে। যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَم.
নারী মাহরাম ছাড়া তিন দিনের সফর করবে না। (সহীহ বুখারী: ১০৮৬; জামে' তিরমিযী: ১১৬৯; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১০৭৫০: মুসনাদে আহমাদ: ৮৫৪৪; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৩৫১৫)
হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لا يَحِلُّ امْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ سَفَرًا يَكُونُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَصَاعِدًا إِلَّا وَمَعَهَا أَبُوهَا، أَوْ أَخُوهَا، أَوْ زَوْجُهَا، أَوْ إِبْنُهَا، أَوْ ذُو مَحْرَمٍ مِنْهَا.
'আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে এমন কোনও নারীর জন্য তিন দিন বা তার বেশি দূরত্বে সফর করা বৈধ নয়, যদি না তার সঙ্গে তার পিতা, তার ভাই, তার স্বামী, তার পুত্র বা অন্য কোনও মাহরাম থাকে।' (জামে' তিরমিযী: ১১৬৯; সুনানে আবু দাউদ: ১৭২৬; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৮৯৮)
হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ مَسِيرَةَ يَوْمَيْنِ إِلَّا وَمَعَهَا زَوْجُهَا أَوْ ذُو مَحْرَم
নারী তার স্বামী বা মাহরাম আত্মীয় ছাড়া দুই দিনের দূরত্বে সফর করবে না। (সহীহ বুখারী: ১৯৯৫; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৫৪০৮; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৪৫০)
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لا يحلُّ لِامْرَأَةٍ مُسْلِمَةٍ تُسَافِرُ مَسِيْرَةَ لَيْلَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا رَجُلٌ ذُو حُرْمَةٍ مِنْهَا.
কোনও মুসলিম নারীর জন্য মাহরাম পুরুষ ছাড়া এক রাতের পথও সফর করা বৈধ নয়। (সুনানে আবু দাউদ: ১৭২৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১০৪০)
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বর্ণিত অপর এক হাদীছে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لَا تُسَافِرُ امْرَأَةٌ بَرِيدًا إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
কোনও নারী মাহরাম ছাড়া এক বারীদ দূরত্বের সফর করবে না। (বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৫৪১২; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৩৪৯৭)
এক বারীদ হলো অর্ধদিবসের সফর। অর্থাৎ বারো মাইলের দূরত্ব। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় এ হাদীছগুলো পরস্পরবিরোধী, যেহেতু একেক হাদীছে একেক রকম দূরত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ হিসেবে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ঠিক কী পরিমাণ দূরত্বে নারীরা বিনা মাহরামে সফর করতে পারবে না?
প্রকৃতপক্ষে এসব হাদীছে কোনও বিরোধ নেই। মূল কথা হলো সফর। পরিভাষায় যেই দূরত্বের গমনকে সফর বলা হয়, সে পরিমাণ দূরত্বে নারীদের জন্য বিনা মাহরামে সফর করা জায়েয নয়। সকলেরই সফর যে সমপরিমাণ দূরত্বে হবে এমন কোনও কথা নেই। একেকজনের সফর একেকরকম দূরত্বে হয়ে থাকে। যার যে পরিমাণ দূরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছে, সে হয়তো সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছে যে, বিনা মাহরামে তার সে সফর করা জায়েয হবে কি না। এভাবে একেকবার একেকজন প্রশ্ন করেছে, আর প্রত্যেকের সফরের দূরত্ব অনুযায়ী উত্তর দেওয়া হয়েছে। ফলে কারও বেলায় তিন দিন তিন রাত, কারও বেলায় দু'দিন দু'রাত বা দু'দিন, কারও বেলায় একদিন এক রাত, কারও বেলায় এক রাত এবং কারও বেলায় আধা দিনের উল্লেখ এসেছে। সবগুলো বর্ণনা সামনে রাখার দ্বারা উপলব্ধি করা যায় যে, নারী যদি কাছাকাছি কোথাও যায়, তবে তার সঙ্গে মাহরাম থাকার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু তার যাওয়াটা যদি হয় দূরে কোথাও এবং সে দূরত্বটা এ পরিমাণ হয়, যাকে সফর নাম দেওয়া চলে, তবে তার সঙ্গে অবশ্যই তার স্বামী বা কোনও মাহরাম ব্যক্তি থাকতে হবে। আর এটা কেবলই তার নিরাপত্তা ও তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার উদ্দেশ্যে। কাজেই পথ যদি নিরাপদ না হয়, তবে কাছাকাছি যাওয়ার বেলায়ও নারীর সঙ্গে মাহরাম থাকা জরুরি হবে। বাইরে নিরাপত্তা না থাকলে মাহরাম ছাড়া সে ঘর থেকে বেরই হবে না।
লক্ষণীয়, উপরে বর্ণিত সবগুলো হাদীছই সাধারণভাবে সফরে নারীদেরকে মাহরাম ছাড়া বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। বোঝা গেল সফর যে উদ্দেশ্যেই হোক, নারীর জন্য মাহরাম ব্যতিরেকে তা জায়েয নয়। এমনকি হজ্জের সফর হলেও। মাহরাম পুরুষসঙ্গী ছাড়া নারীর জন্য হজ্জের সফর করা জায়েয হবে না। কাজেই তার উপর হজ্জ ফরয হবে কেবল তখনই, যখন নিজের খরচার সঙ্গে মাহরাম সঙ্গীর খরচা বহনেরও সামর্থ্য তার থাকবে।
ইবন কুতায়বা রহ. হায়ছাম ইবন আদী রহ.-এর সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন যে, এক নারী মক্কায় (হজ্জ বা উমরার উদ্দেশ্যে) এসেছিল। সে ছিল সুন্দরী। তার প্রতি এক ব্যক্তির নজর পড়লে সে আকৃষ্ট হয়ে যায়। কাছে এসে কথা বলতে চেষ্টা করে। কিন্তু নারী তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করল না। পরের দিন আবারও তার সঙ্গে দেখা হলো এবং কথা বলতে চেষ্টা করল। এদিনও সে নারী তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করল না। কিন্তু লোকটি নাছোড়। একপর্যায়ে নারী বলল, ওহে, তুমি সরে যাও। তুমি আল্লাহ তা'আলার হারামের মধ্যে আছ এবং এ দিনগুলোও বড় পবিত্র। তারপরও সে কথা বলতে চেষ্টা করল। নারী ভয় পেল যে, না জানি এটা প্রচার হয়ে যায়। পরের দিন সে নারী বের হওয়ার সময় তার ভাইকে বলল, ভাই তুমিও আমার সঙ্গে বের হও। তুমি আমাকে মানাসিক (হজ্জ বা উমরার নিয়মাবলি) দেখিয়ে দাও। আমি তা জানি না। সুতরাং এদিন তার ভাইও তার সঙ্গে বের হলো। লোকটি তো অপেক্ষায়ই ছিল। সে ওই নারীকে দেখামাত্র এগিয়ে আসল এবং কথা বলতে চাইল। কিন্তু সহসাই নজরে পড়ল যে, তার সঙ্গে পুরুষসঙ্গী আছে। অমনি সে সটকে পড়ল। পরে এ ঘটনা তৎকালীন আমীরুল মুমিনীন আবূ জা'ফর মানসূরকে শোনানো হলে তিনি বলেন, আমার মনে চায় কুরায়শের এমন কোনও যুবতী যেন না থাকে, যে এ ঘটনাটি শোনেনি (কেননা সে এর দ্বারা জানতে পারবে বাইরে বের হতে মাহরাম সঙ্গী রাখা কতটা জরুরি)।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. মুমিন নর-নারীর কর্তব্য সকল কাজে ঈমানের দাবি পূরণ করা।
খ. মাহরাম ছাড়া নারীর জন্য সফর করাটা ঈমানের দাবি-পরিপন্থি। কাজেই তার জন্য এটা জায়েয নয়।
গ. হজ্জের সফরেও নারীর সঙ্গে মাহরাম থাকা জরুরি।
ঘ. নারী যুবতী হোক বা বৃদ্ধা, ফরসা হোক বা কালো, কোনও অবস্থায়ই তার জন্য মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েয নয়।
প্রথম কথা হলো সফরকালে নারীর জন্য মাহরাম পুরুষ সঙ্গে রাখা ঈমানের দাবি। আর তা না রাখাটা ঈমানের পরিপন্থী। বিধানটি আল্লাহপ্রদত্ত। তাই আল্লাহর প্রতি যার ঈমান আছে তার কর্তব্য তাঁর দেওয়া বিধান মেনে চলা। যদি তা না মানে, তবে আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আখিরাতের প্রতি যার ঈমান আছে, তার অবশ্যই সে ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টাও থাকবে। তাই আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নারীকে সতর্ক করা হয়েছে সে যেন মাহরাম পুরুষ ছাড়া কিছুতেই সফর না করে।
দ্বিতীয় কথা হলো সফরে নারী তার সঙ্গে যে পুরুষকে নেবে, তাকে অবশ্যই মাহরাম হতে হবে। গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষকে সঙ্গে নেওয়া বা পরপুরুষের সঙ্গে যাওয়া কিছুতেই জায়েয হবে না। এরূপ করাটাও ঈমানের দাবির পরিপন্থী। গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষের সঙ্গে তো বাড়িতেও একত্রে অবস্থান করা এবং বিনা প্রয়োজনে কথা বলা জায়েয হয় না। অথচ সফরের তুলনায় বাড়িতে যথেষ্ট নিরাপত্তা থাকে। এ অবস্থায় পরপুরুষের সঙ্গে সফরে যাওয়া কীভাবে বৈধ হতে পারে? বরং তা অধিকতর গর্হিত ও নাজায়েয হবে, যদিও প্রশাসনিক বা আইনগত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে।
তৃতীয় কথা হলো একাকী বা পরপুরুষের সঙ্গে যাতায়াত নিষেধ করা হয়েছে সফরের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ যতটুকু দূরত্বে গেলে সে গমনকে সফর নামে অভিহিত করা যায়, সে পরিমাণ দূরত্বের বেলায়ই এ বিধান। এর কম দূরত্বে গেলে মাহরাম পুরুষ সঙ্গে থাকা জরুরি নয়। আলোচ্য হাদীছে সে দূরত্বের পরিমাণ বলা হয়েছে একদিন এক রাতের পথ। অর্থাৎ পায়ে হেঁটে বা উটের পিঠে একদিন এক রাত চললে যতদূর যাওয়া যায়, সেটাই হলো একদিন এক রাতের পথ, যদিও গাড়ি-ঘোড়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই সে পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করা যায়।
প্রকাশ থাকে যে, দূরত্বের পরিমাণ সম্পর্কে হাদীছের বর্ণনা বিভিন্ন রকম। আলোচ্য হাদীছে বলা হয়েছে একদিন এক রাতের পথ। কোনও কোনও হাদীছে তিন দিন তিন রাতের কথাও আছে। যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَم.
নারী মাহরাম ছাড়া তিন দিনের সফর করবে না। (সহীহ বুখারী: ১০৮৬; জামে' তিরমিযী: ১১৬৯; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ১০৭৫০: মুসনাদে আহমাদ: ৮৫৪৪; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৩৫১৫)
হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لا يَحِلُّ امْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ سَفَرًا يَكُونُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَصَاعِدًا إِلَّا وَمَعَهَا أَبُوهَا، أَوْ أَخُوهَا، أَوْ زَوْجُهَا، أَوْ إِبْنُهَا، أَوْ ذُو مَحْرَمٍ مِنْهَا.
'আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে এমন কোনও নারীর জন্য তিন দিন বা তার বেশি দূরত্বে সফর করা বৈধ নয়, যদি না তার সঙ্গে তার পিতা, তার ভাই, তার স্বামী, তার পুত্র বা অন্য কোনও মাহরাম থাকে।' (জামে' তিরমিযী: ১১৬৯; সুনানে আবু দাউদ: ১৭২৬; সুনানে ইবন মাজাহ: ২৮৯৮)
হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ مَسِيرَةَ يَوْمَيْنِ إِلَّا وَمَعَهَا زَوْجُهَا أَوْ ذُو مَحْرَم
নারী তার স্বামী বা মাহরাম আত্মীয় ছাড়া দুই দিনের দূরত্বে সফর করবে না। (সহীহ বুখারী: ১৯৯৫; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৫৪০৮; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৪৫০)
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لا يحلُّ لِامْرَأَةٍ مُسْلِمَةٍ تُسَافِرُ مَسِيْرَةَ لَيْلَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا رَجُلٌ ذُو حُرْمَةٍ مِنْهَا.
কোনও মুসলিম নারীর জন্য মাহরাম পুরুষ ছাড়া এক রাতের পথও সফর করা বৈধ নয়। (সুনানে আবু দাউদ: ১৭২৩; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১০৪০)
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বর্ণিত অপর এক হাদীছে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لَا تُسَافِرُ امْرَأَةٌ بَرِيدًا إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
কোনও নারী মাহরাম ছাড়া এক বারীদ দূরত্বের সফর করবে না। (বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৫৪১২; তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার: ৩৪৯৭)
এক বারীদ হলো অর্ধদিবসের সফর। অর্থাৎ বারো মাইলের দূরত্ব। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় এ হাদীছগুলো পরস্পরবিরোধী, যেহেতু একেক হাদীছে একেক রকম দূরত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ হিসেবে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ঠিক কী পরিমাণ দূরত্বে নারীরা বিনা মাহরামে সফর করতে পারবে না?
প্রকৃতপক্ষে এসব হাদীছে কোনও বিরোধ নেই। মূল কথা হলো সফর। পরিভাষায় যেই দূরত্বের গমনকে সফর বলা হয়, সে পরিমাণ দূরত্বে নারীদের জন্য বিনা মাহরামে সফর করা জায়েয নয়। সকলেরই সফর যে সমপরিমাণ দূরত্বে হবে এমন কোনও কথা নেই। একেকজনের সফর একেকরকম দূরত্বে হয়ে থাকে। যার যে পরিমাণ দূরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছে, সে হয়তো সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছে যে, বিনা মাহরামে তার সে সফর করা জায়েয হবে কি না। এভাবে একেকবার একেকজন প্রশ্ন করেছে, আর প্রত্যেকের সফরের দূরত্ব অনুযায়ী উত্তর দেওয়া হয়েছে। ফলে কারও বেলায় তিন দিন তিন রাত, কারও বেলায় দু'দিন দু'রাত বা দু'দিন, কারও বেলায় একদিন এক রাত, কারও বেলায় এক রাত এবং কারও বেলায় আধা দিনের উল্লেখ এসেছে। সবগুলো বর্ণনা সামনে রাখার দ্বারা উপলব্ধি করা যায় যে, নারী যদি কাছাকাছি কোথাও যায়, তবে তার সঙ্গে মাহরাম থাকার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু তার যাওয়াটা যদি হয় দূরে কোথাও এবং সে দূরত্বটা এ পরিমাণ হয়, যাকে সফর নাম দেওয়া চলে, তবে তার সঙ্গে অবশ্যই তার স্বামী বা কোনও মাহরাম ব্যক্তি থাকতে হবে। আর এটা কেবলই তার নিরাপত্তা ও তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার উদ্দেশ্যে। কাজেই পথ যদি নিরাপদ না হয়, তবে কাছাকাছি যাওয়ার বেলায়ও নারীর সঙ্গে মাহরাম থাকা জরুরি হবে। বাইরে নিরাপত্তা না থাকলে মাহরাম ছাড়া সে ঘর থেকে বেরই হবে না।
লক্ষণীয়, উপরে বর্ণিত সবগুলো হাদীছই সাধারণভাবে সফরে নারীদেরকে মাহরাম ছাড়া বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। বোঝা গেল সফর যে উদ্দেশ্যেই হোক, নারীর জন্য মাহরাম ব্যতিরেকে তা জায়েয নয়। এমনকি হজ্জের সফর হলেও। মাহরাম পুরুষসঙ্গী ছাড়া নারীর জন্য হজ্জের সফর করা জায়েয হবে না। কাজেই তার উপর হজ্জ ফরয হবে কেবল তখনই, যখন নিজের খরচার সঙ্গে মাহরাম সঙ্গীর খরচা বহনেরও সামর্থ্য তার থাকবে।
ইবন কুতায়বা রহ. হায়ছাম ইবন আদী রহ.-এর সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন যে, এক নারী মক্কায় (হজ্জ বা উমরার উদ্দেশ্যে) এসেছিল। সে ছিল সুন্দরী। তার প্রতি এক ব্যক্তির নজর পড়লে সে আকৃষ্ট হয়ে যায়। কাছে এসে কথা বলতে চেষ্টা করে। কিন্তু নারী তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করল না। পরের দিন আবারও তার সঙ্গে দেখা হলো এবং কথা বলতে চেষ্টা করল। এদিনও সে নারী তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করল না। কিন্তু লোকটি নাছোড়। একপর্যায়ে নারী বলল, ওহে, তুমি সরে যাও। তুমি আল্লাহ তা'আলার হারামের মধ্যে আছ এবং এ দিনগুলোও বড় পবিত্র। তারপরও সে কথা বলতে চেষ্টা করল। নারী ভয় পেল যে, না জানি এটা প্রচার হয়ে যায়। পরের দিন সে নারী বের হওয়ার সময় তার ভাইকে বলল, ভাই তুমিও আমার সঙ্গে বের হও। তুমি আমাকে মানাসিক (হজ্জ বা উমরার নিয়মাবলি) দেখিয়ে দাও। আমি তা জানি না। সুতরাং এদিন তার ভাইও তার সঙ্গে বের হলো। লোকটি তো অপেক্ষায়ই ছিল। সে ওই নারীকে দেখামাত্র এগিয়ে আসল এবং কথা বলতে চাইল। কিন্তু সহসাই নজরে পড়ল যে, তার সঙ্গে পুরুষসঙ্গী আছে। অমনি সে সটকে পড়ল। পরে এ ঘটনা তৎকালীন আমীরুল মুমিনীন আবূ জা'ফর মানসূরকে শোনানো হলে তিনি বলেন, আমার মনে চায় কুরায়শের এমন কোনও যুবতী যেন না থাকে, যে এ ঘটনাটি শোনেনি (কেননা সে এর দ্বারা জানতে পারবে বাইরে বের হতে মাহরাম সঙ্গী রাখা কতটা জরুরি)।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. মুমিন নর-নারীর কর্তব্য সকল কাজে ঈমানের দাবি পূরণ করা।
খ. মাহরাম ছাড়া নারীর জন্য সফর করাটা ঈমানের দাবি-পরিপন্থি। কাজেই তার জন্য এটা জায়েয নয়।
গ. হজ্জের সফরেও নারীর সঙ্গে মাহরাম থাকা জরুরি।
ঘ. নারী যুবতী হোক বা বৃদ্ধা, ফরসা হোক বা কালো, কোনও অবস্থায়ই তার জন্য মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েয নয়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)