কিতাবুস সুনান - ইমাম আবু দাউদ রহঃ

২. নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৫২৮
আন্তর্জাতিক নং: ১৫২৮
নামাযের অধ্যায়
৩৬৭. ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা সম্পর্কে।
১৫২৮. আবু সালেহ (রাহঃ) ...... আবু মুসা আশআরী (রাযিঃ) হতে পূর্ববর্তী হাদীসের অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। রাবী বলেন, অতঃপর নবী করীম (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ হে জনগণ! তোমরা নিম্নস্বর ব্যবহার করে তোমাদের নফসের প্রতি সুবিচার কর।
كتاب الصلاة
باب فِي الاِسْتِغْفَارِ
حَدَّثَنَا أَبُو صَالِحٍ، مَحْبُوبُ بْنُ مُوسَى أَخْبَرَنَا أَبُو إِسْحَاقَ الْفَزَارِيُّ، عَنْ عَاصِمٍ، عَنْ أَبِي عُثْمَانَ، عَنْ أَبِي مُوسَى، بِهَذَا الْحَدِيثِ وَقَالَ فِيهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " يَا أَيُّهَا النَّاسُ ارْبَعُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ " .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এখানে হাদীসটি সংক্ষিপ্ত আকারে আনা হয়েছে। অন্যান্য বর্ণনার আলোকে নিম্নে পূর্ণাঙ্গ হাদীস ও তার ব্যাখ্যা পেশ করা হলো।

হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি. বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। তখন আমরা যখনই কোনও উপত্যকায় পৌঁছতাম, তখন বলতাম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। তাতে আমাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে যেত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে লোকসকল! নিজেদের প্রতি সদয় হও। তোমরা তো কোনও বধির ও অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না। তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন। তিনি সবকিছু শোনেন, তিনি নিকটবর্তী। -বুখারী ও মুসলিম

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক সফরে ছিলেন। সে সফরের যাতায়াতকালীন অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-

فَكُنَّا إِذَا أَشْرَفْنَا عَلَى وَادٍ، هَلَّلْنَا وَكَبَّرْنَا ارْتَفَعَتْ أَصْوَاتُنَا

(তখন আমরা যখনই কোনও উপত্যকায় পৌঁছতাম, তখন বলতাম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। তাতে আমাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে যেত)। বস্তুত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরামও আল্লাহ তা'আলার যিকির ও স্মরণকে তাঁদের প্রাণের খোরাক বানিয়ে নিয়েছিলেন। সর্বাবস্থায় তাঁরা যিকির করতে ভালোবাসতেন। এর মধ্যে তাঁরা শান্তি পেতেন এবং পেতেন দেহমনে শক্তি। তাই তো সফরের কষ্টকর চলার ভেতরও তাঁরা আল্লাহর যিকির জারি রাখতেন। এমনকি যিকিরের আনন্দ ও উদ্দীপনায় তাঁরা পথচলার কষ্টও ভুলে যেতেন। ফলে যিকির করতে গিয়ে তাদের আওয়াজ উঁচু হয়ে যেত। তাঁরা উচ্চশব্দে বলতে থাকতেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। এতে যদিও পথচলার কষ্ট লাঘব হতো, কিন্তু অবিরাম উচ্চ আওয়াজ শরীরের পক্ষে ক্লান্তিকর বটে। কায়িক শ্রমের মতো উচ্চ আওয়াজ করতে থাকার মধ্যেও যথেষ্ট কষ্ট-ক্লেশ হয়ে থাকে। পরম মমতাশীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় সাহাবীদের সে কষ্ট নিবারণ করতে চাইলেন। তিনি তাদের লক্ষ্য করে বললেন-

يا أَيُّها النَّاسُ، ارْبَعُوْا عَلَى أَنْفُسِكُمْ (হে লোকসকল! নিজেদের প্রতি সদয় হও)। অর্থাৎ তোমরা আওয়াজ উঁচু করো না। এভাবে আওয়াজ উঁচু করতে থাকলে তোমাদের কষ্ট হবে। শরীর ক্লান্ত হবে। তাতে তোমাদের সফরের চলা অব্যাহত রাখা কঠিন হবে। তাছাড়া তোমাদের আরও কত কাজ রয়েছে। উচ্চ আওয়াজ করে যদি শরীর ক্লান্ত করে ফেল, তবে সেসব কাজ কীভাবে আঞ্জাম দেবে? সুতরাং নিজেদের প্রতি সদয় হও এবং আওয়াজ উঁচু করা থেকে ক্ষান্ত হও।

তারা আওয়াজ উঁচু করছিলেন আল্লাহ তা'আলার যিকিরে। যিকির করার উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহ তা'আলাকে শোনানো ও তাঁকে দেখানো। এটা বান্দার মনের আকুতি যে, আল্লাহ দেখুন তাঁর বান্দা কীভাবে তাঁকে স্মরণ করছে। বলাবাহুল্য, যিকিরের এ উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য আওয়াজ উঁচু করার দরকার হয় না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

فَإِنَّكُمْ لاَ تَدْعُونَ أَصَمَّ وَلاَ غَائِبًا، إِنَّهُ مَعَكُمْ إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ (তোমরা তো কোনও বধির ও অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না। তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন। তিনি সবকিছু শোনেন, তিনি নিকটবর্তী)। অর্থাৎ তোমরা যিকির দ্বারা যাকে ডাকছ সেই আল্লাহ বধির তো ননই; বরং তিনি সর্বশ্রোতা, সবকিছু শোনেন। যত ক্ষীণ আওয়াজই হোক না কেন, তা শুনতে তাঁর কোনও অসুবিধা হয় না। মসৃণ পাথরের উপর পিঁপড়ের পা ফেলায় যে আওয়াজ হয়, তাও তিনি শুনতে পান। কাজেই তোমরা উচ্চ আওয়াজে যিকির করলে যেমন তিনি শোনেন, তেমনি যত ক্ষীণ আওয়াজেই যিকির কর না কেন, তাও তিনি শুনবেন। এ অবস্থায় অহেতুক আওয়াজ উঁচু করা কেন?

এমনিভাবে উচ্চ আওয়াজের অঙ্গভঙ্গি তোমরা তাঁকে দেখাতে চাও? তাঁর দৃষ্টিশক্তি মাখলুকের মতো নাকি যে, তা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই কাজ করবে? তিনি যেমন সবকিছু শোনেন, তেমনি দেখেনও সবকিছুই। গভীর অন্ধকারের মধ্যে যা-কিছু ঘটে, তাও তিনি সূর্যালোকে করা কাজকর্মের মতোই দেখেন।

তোমরা কি ভাবছ যে তিনি অনেক দূরে রয়েছেন, তাই আওয়াজ উচ্চ করে তাঁকে দেখাতে ও শোনাতে হবে? না, তিনি তোমাদের কাছেই। সারা জাহানের সমস্ত মাখলুক তাঁর সামনে রয়েছে। তাঁর দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি সবকিছু পরিবেষ্টন করে রেখেছে। বড় থেকে বড় কোনও প্রতিবন্ধকও তাঁর থেকে কোনও মাখলুককে আড়াল করতে পারে না। কোনওরকম বাধা তাঁর শ্রবণশক্তির সামনে অন্তরায় হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-

وَاِذَا سَاَلَکَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ

'(হে নবী!) আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি তাদেরকে বলুন যে,) আমি এত নিকটবর্তী যে, কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)

وَمَا تَکُوۡنُ فِیۡ شَاۡنٍ وَّمَا تَتۡلُوۡا مِنۡہُ مِنۡ قُرۡاٰنٍ وَّلَا تَعۡمَلُوۡنَ مِنۡ عَمَلٍ اِلَّا کُنَّا عَلَیۡکُمۡ شُہُوۡدًا اِذۡ تُفِیۡضُوۡنَ فِیۡہِ

'(হে নবী!) তুমি যে-অবস্থায়ই থাক এবং কুরআনের যে-অংশই তিলাওয়াত কর এবং (হে মানুষ!) তোমরা যে-কাজই কর, তোমরা যখন তাতে লিপ্ত থাক, তখন আমি তোমাদের দেখতে থাকি। (সূরা ইউনুস, আয়াত ৬১)

মোটকথা আল্লাহ তা'আলা সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। তাই যিকিরে আওয়াজ উচ্চ করার প্রয়োজন নেই। বিশেষ প্রয়োজনীয় স্থান ছাড়া সাধারণ অবস্থায় যিকির নিম্নস্বরে করাই বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-

ااُدۡعُوۡا رَبَّکُمۡ تَضَرُّعًا وَّخُفۡیَۃً ؕ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُعۡتَدِیۡنَ ۚ

'তোমরা বিনীতভাবে ও চুপিসারে নিজেদের প্রতিপালককে ডাকো। নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা আ'রাফ, আয়াত ৫৫)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সর্বাবস্থায় যিকিরের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

খ. নিয়ম হলো উপরে ওঠার সময় তাকবীর বলা।

গ. যিকির নিম্ন আওয়াজে করা উত্তম।

ঘ. ইবাদত-বন্দেগীতে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট-ক্লেশ করা বাঞ্ছনীয় নয়।

ঙ. শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দু'টি গুণ এবং এ গুণদু'টিও তাঁর অন্যান্য গুণের মতো অসীম।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)