আল মুসনাদুস সহীহ- ইমাম মুসলিম রহঃ

৫৪- জান্নাতের নিআমত ও জান্নাতীদের বর্ণনা

হাদীস নং: ৬৯৪৯
আন্তর্জাতিক নং: ২৮৬৭
- জান্নাতের নিআমত ও জান্নাতীদের বর্ণনা
১৭. মৃত ব্যক্তিকে তার জান্নাত কিংবা জাহান্নামের ঠিকানা প্রদর্শন করানো, কবরের আযাবের প্রমাণ এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দুআ করা
৬৯৪৯। ইয়াহয়া ইবনে আইয়ুব ও আবু বকর ইবনে আবি শাঈবা (রাহঃ) ......... যায়দ ইবনে সাবিত (রাযিঃ) এর সূত্রে আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট উপস্থিত ছিলাম না, বরং আমাকে যায়দ ইবনে সাবিত (রাযিঃ) বর্ণনা করেছেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নাজ্জার গোত্রের একটি প্রাচীর বেষ্টিত বাগানে তাঁর একটি খচ্চরের উপর সওয়ার ছিলেন। এ সময় আমরা তাঁর সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ সেটি (খচ্চর) লাফিয়ে উঠলো এবং তাঁকে ফেলে দেয়ার উপক্রম করল। দেখা গেল, সেখানে ছয়টি কিংবা পাঁচটি অথবা চারটি কবর রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, জুবাইরী অনুরূপ বর্ণনা করতেন।

অতঃপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ কবরবাসীদেরকে কে চিনে? তখন এক ব্যক্তি বললেন, আমি (চিনি)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞাসা করলেনঃ তারা কখন মৃত্যুবরণ করেছে? তিনি বললেন, তারা শিরকের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এ উম্মতকে তাদের কবরের মধ্যে বিপদগ্রস্ত করা হবে। তোমরা মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা বর্জন করবে, এ আশঙ্কা না হলে আমি আল্লাহর নিকট দুআ করতাম যেন তিনি তোমাদেরকেও কবরের আযাব শুনান যা আমি শুনতে পাচ্ছি। অতঃপর তিনি আমাদের প্রতি তাঁর মুখমণ্ডল ফিরিয়ে নিয়ে বললেনঃ তোমরা সকলে জাহান্নামের শাস্তি হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।

তারা (সাহাবীগণ) বললেন, জাহান্নামের শাস্তি হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। অতঃপর তিনি বললেনঃ তোমরা সকলে কবরের আযাব হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। সাহবীগণ বললেন, কবরের আযাব হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। অতঃপর বললেনঃ তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সমুদয় ফিতনা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। তারা বললেন, প্রকাশ্য ও গোপন সমুদয় ফিতনা হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। এরপর তিনি আবারো বললেনঃ তোমরা দাজ্জালের ফিতনা হতে আল্লাহর নিকট পানাহ চাও। তারা (সাহাবীগণ) বললেন, দাজ্জালের ফিতনা হতে আমরা আল্লাহর নিকট পানাহ চাই।
كتاب الجنة وصفة نعيمها وأهلها
بَاب عَرْضِ مَقْعَدِ الْمَيِّتِ مِنْ الْجَنَّةِ أَوْ النَّارِ عَلَيْهِ وَإِثْبَاتِ عَذَابِ الْقَبْرِ وَالتَّعَوُّذِ مِنْهُ
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ، وَأَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ جَمِيعًا عَنِ ابْنِ عُلَيَّةَ، قَالَ ابْنُ أَيُّوبَ حَدَّثَنَا ابْنُ عُلَيَّةَ، قَالَ وَأَخْبَرَنَا سَعِيدٌ الْجُرَيْرِيُّ، عَنْ أَبِي نَضْرَةَ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ، قَالَ أَبُو سَعِيدٍ وَلَمْ أَشْهَدْهُ مِنَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَلَكِنْ حَدَّثَنِيهِ زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ قَالَ بَيْنَمَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِي حَائِطٍ لِبَنِي النَّجَّارِ عَلَى بَغْلَةٍ لَهُ وَنَحْنُ مَعَهُ إِذْ حَادَتْ بِهِ فَكَادَتْ تُلْقِيهِ وَإِذَا أَقْبُرٌ سِتَّةٌ أَوْ خَمْسَةٌ أَوْ أَرْبَعَةٌ - قَالَ كَذَا كَانَ يَقُولُ الْجُرَيْرِيُّ - فَقَالَ " مَنْ يَعْرِفُ أَصْحَابَ هَذِهِ الأَقْبُرِ " . فَقَالَ رَجُلٌ أَنَا . قَالَ " فَمَتَى مَاتَ هَؤُلاَءِ " . قَالَ مَاتُوا فِي الإِشْرَاكِ . فَقَالَ " إِنَّ هَذِهِ الأُمَّةَ تُبْتَلَى فِي قُبُورِهَا فَلَوْلاَ أَنْ لاَ تَدَافَنُوا لَدَعَوْتُ اللَّهَ أَنْ يُسْمِعَكُمْ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ الَّذِي أَسْمَعُ مِنْهُ " . ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا بِوَجْهِهِ فَقَالَ " تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ النَّارِ " . قَالُوا نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ النَّارِ فَقَالَ " تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ " . قَالُوا نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ . قَالَ " تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنَ الْفِتَنِ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ " . قَالُوا نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الْفِتَنِ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ قَالَ " تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ الدَّجَّالِ " . قَالُوا نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ الدَّجَّالِ .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ সংক্রান্ত কোন কোন হাদীস থেকে আমরা অবগত হয়েছি যে, বারযাখের (কবর) আযাব জিন এবং মানুষ থেকে গোপন রাখা হয়েছে। তারা মোটেই টের পায় না। অন্যান্য প্রাণী তার কিঞ্চিত টের পেয়ে থাকে। এ হাদীস থেকে একথাও জানা যায় যে, বনু নাজ্জারের উল্লিখিত বাগানে দাফনকৃত ব্যক্তিদের উপর যে আযাব হচ্ছিল তা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গী সাথীগণ টের না পেলেও আল্লাহর রাসূল (সা) যে মাদী খচ্চরের উপর আরোহিত ছিলেন সেই পশু তা টের পেয়েছিল এবং তার উপর তার প্রভাবও পড়েছিল। এর মধ্যে যে হিকমত অন্তর্নিহিত তাহল: মৃত্যুর পর মৃতব্যক্তির উপর যা ঘটে থাকে তা যদি আমরা দেখতে বা শুনতে সক্ষম হতাম, তাহলে ঈমান বিল গায়েবের প্রয়োজন থাকত না এবং দুনিয়ার বর্তমান নেযাম অচল হয়ে যেত। যখন আমাদের সামনে আমাদের কোন প্রিয়জন দুঃখকষ্ট বা বিপদের সম্মুখীন হয় তখন আমাদের দ্বারা কোন কাজ করা সম্ভব হয় না। যদি কবরের আযাবের রহস্য আমাদের সামনে উন্মোচিত করে দেয়া হত, তাহলে আমাদের দ্বারা কোন কাজ করাত দূরের কথা মা তার শিশুকে দুধ পর্যন্ত পান কারনর জন্য প্রস্তুত থাকত না। এ হাদীস থেকে এটা আমরা অবগত হয়েছি যে, কবরবাসীদের আযাব এবং তাদের চীৎকার সাহবায়ে কিরাম মোটেই শুনতে না পেলেও নবী করীম (ﷺ) তা শুনতে পেয়েছিলেন।

অনুরূপভাবে ওহীর ফেরেশতা নবী করীম (ﷺ)-এর নিকট আগমনের সময় সাহাবায়ে কিরাম তার দরবারে হাযির থাকলেও তারা তার উপস্থিতি টের পেতেন না এবং তাঁরা তাঁকে দেখতে পেতেন না এবং তাঁর আওয়াজও শুনতে পেতেন না। অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে দেখতেন এবং তাঁর আওয়াজ শুনতে পেতেন।১
কিন্তু তার ব্যতিক্রম কোন হেকমত এবং মুসলিহাত অনুসারে বারযাখের আযারের অংশবিশেষ বা তার অবস্থা কোন বান্দাহকে প্রদর্শন করা এ নির্ধারিত নিয়ম ও সুন্নাতের বিপরীত নয়। শেখ ইবনুল কাইয়্যুম তাঁর কিতাবুর রুহ (كتاب الرو) গ্রন্থে এ জাতীয় অনেক ঘটনার উল্লেখ করে যে মন্তব্য করেছেন তার সারমর্ম হল, 'আমি যে সব ঘটনার উল্লেখ করেছি অনুরূপ অনেক ঘটনা রয়েছে যা এ গ্রন্থে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। আল্লাহ কোন কোন সময় তার কোন কোন বিশেষ বান্দাহকে জাগ্রত অবস্থায় চর্ম চোখের দ্বারা কবরের আযাব এবং সোয়াবের 'মুশাহিদা' করে দেন এসব 'মুশাহিদার' কাহিনী লিপিবদ্ধ করলে কয়েক খণ্ড পুস্তকের প্রয়োজন হবে। কিন্তু মুলহিদ এবং জিন্দিক ধরনের লোকের অবস্থা হল, যে জ্ঞান তাদের নেই এবং যে রহস্য এবং হাকীকত থেকে তারা বঞ্চিত তা তারা সরাসরি অস্বীকার করে বসে।

আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
لولا أن لا تدفنُو لَدَعُوتُ اللهِ أَنْ يُسْمِعُكُمْ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ الَّذِي أسمع منه

"যদি এ আশঙ্কা না হত যে, তোমরা মৃতকে দাফন করবে না, তাহলে আমি কবরের যে আযাব শুনেছি তা তোমাদের শুনার জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ করতাম।
তার অর্থ হল, কবরের আযাবের যে অবস্থা আল্লাহ্ আমাকে প্রদর্শন করেন এবং আযাব প্রাপ্তদের যে চীৎকার আমি শুনি তা যদি আল্লাহ তোমাদেরকে প্রদর্শন করেন এবং আমার মত তোমরাও তা শুন, তাহলে ভয়ে তোমরা মৃতব্যক্তির দাফন-কাফনের কোন ইনতেজামও করবে না।"
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কবরের আযাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করার জন্য সাহাবায়ে কিরামকে নসিহত করেছেন। এ থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হল, কবরের আযাব কোন ধরনের তা জানবার এবং দেখার আগ্রহ না করে তা থেকে কি করে নাজাত লাভ করা যায় সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা মুমিন ব্যক্তির একান্ত কর্তব্য।

বস্তুতঃ যাবতীয় ফেৎনা থেকে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই মানুষকে রক্ষা করতে পারেন। তাই সদা সর্বদা তার নিকট যেন আমরা প্রার্থনা করি কবরের আযাব থেকে নাজাত লাভ করার জন্য, দোযখের আযাব থেকে পরিত্রাণ লাভ করার জন্য, যাবতীয় প্রকাশ্য ও গোপনীয় আযাব এবং ফেতনা থেকে নিরাপদ থাকার জন্য বিশেষভাবে দাজ্জালের মহাবিপদ ও ফিতনা, কুফর, শিরক এবং এমন সব ফিতনা যা আল্লাহর গযব তরান্বিত করে তা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য।

اللَّهُمَّ إنا نَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَنَعُوذُبِكَ مِنْ عَذَابِ النَّارِ ونعوذ بك من الفتن ماظهر منها وما بطن وَنَعُوذُبِكَ مِنْ فِتْنَة الدجال

টিকা ১. বি:দ্র: জিন ও মানুষের নিকট বারযাখের আযার যে গোপনীয় রাখা হয়েছে তা আল্লাহর নির্ধারিত সুন্নাত। আমরা তো দেখতে বা শুনতে পাই না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)