আল মুসনাদুস সহীহ- ইমাম মুসলিম রহঃ

৪৭- সাহাবায়ে কিরামের রাঃ মানাকিব ও ফাযায়েল

হাদীস নং: ৬০০২
আন্তর্জাতিক নং: ২৪০৪-৪
- সাহাবায়ে কিরামের রাঃ মানাকিব ও ফাযায়েল
৪. আলী ইবনে আবু তালিব (রাযিঃ) এর ফযীলত
৬০০২। কুতায়বা ইবনে সাঈদ ও মুহাম্মাদ ইবনে আব্বাদ (রাহঃ) ......... আমির ইবনে সা’দ (রাহঃ) সূত্রে সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রাযিঃ) সা’দ (রাহঃ) কে আমীর বানালেন এবং বললেন, আপনি আলী (রাযিঃ) কে কেন মন্দ বলেন না? সা’দ বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সম্পর্কে যে তিনটি কথা বলেছেনঃ তা মনে করে এ কারণে আমি কখনও তাকে মন্দ বলবো না। ওসব কথার মধ্য হতে যদি একটিও আমি লাভ করতে পারতাম তাহলে তা আমার জন্য লাল উটের চেয়েও বেশী পছন্দনীয় হতো।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আলী (রাযিঃ) এর উদ্দেশ্যে বলতে শুনেছি, আলী (রাযিঃ) কে কোন যুদ্ধের সময় প্রতিনিধি বানিয়ে রেখে গেলে তিনি বললেন, মহিলা ও শিশুদের মাঝে আমাকে রেখে যাচ্ছে, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তুমি কি এতে আনন্দবোধ কর না যে, আমার কাছে তোমার মর্যাদা মুসা (আলাইহিস সালাম) এর কাছে হারুন (আলাইহিস সালাম) এর মতো। তবে মনে রাখতে হবে যে, আমার পর আর কোন নবী নেই।

খায়বরের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আমি বলতে শুনেছি, আমি এমন এক ব্যক্তিকে পতাকা দেবো যে আল্লাহ ও তার রাসুল (ﷺ) কে ভালবাসে আর আল্লাহ ও তার রাসুলও তাকে ভালবাসেন। এ কথা শুনে আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। তখন তিনি বললেন, আলীকে ডাকো। আলী আসলেন, তাঁর চোখ উঠেছিলো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর চোখে লালা দিলেন এবং তাঁর হাতে পতাকা অর্পণ করলেন। পরিশেষে তাঁর হাতেই বিজয় তুলে দিলেন আল্লাহ।

আর যখন (মুবাহালা সংক্রান্ত) আয়াতঃ “আমরা আমাদের এবং তোমাদের সন্তান-সন্ততিকে ডাকি” (৩ঃ ৬১) অবতীর্ণ হলো, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন (রাযিঃ) কে ডাকলেন। অতঃপর বললেন হে আল্লাহ! এরাই আমার পরিবার।
كتاب فضائل الصحابة رضى الله تعالى عنهم
باب مِنْ فَضَائِلِ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رضى الله عنه
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبَّادٍ، - وَتَقَارَبَا فِي اللَّفْظِ - قَالاَ حَدَّثَنَا حَاتِمٌ، - وَهُوَ ابْنُ إِسْمَاعِيلَ - عَنْ بُكَيْرِ بْنِ مِسْمَارٍ، عَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ أَمَرَ مُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ سَعْدًا فَقَالَ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسُبَّ أَبَا التُّرَابِ فَقَالَ أَمَّا مَا ذَكَرْتُ ثَلاَثًا قَالَهُنَّ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَلَنْ أَسُبَّهُ لأَنْ تَكُونَ لِي وَاحِدَةٌ مِنْهُنَّ أَحَبُّ إِلَىَّ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لَهُ خَلَّفَهُ فِي بَعْضِ مَغَازِيهِ فَقَالَ لَهُ عَلِيٌّ يَا رَسُولَ اللَّهِ خَلَّفْتَنِي مَعَ النِّسَاءِ وَالصِّبْيَانِ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُونَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُونَ مِنْ مُوسَى إِلاَّ أَنَّهُ لاَ نُبُوَّةَ بَعْدِي " . وَسَمِعْتُهُ يَقُولُ يَوْمَ خَيْبَرَ " لأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ رَجُلاً يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ " . قَالَ فَتَطَاوَلْنَا لَهَا فَقَالَ " ادْعُوا لِي عَلِيًّا " . فَأُتِيَ بِهِ أَرْمَدَ فَبَصَقَ فِي عَيْنِهِ وَدَفَعَ الرَّايَةَ إِلَيْهِ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ ( فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ) دَعَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلِيًّا وَفَاطِمَةَ وَحَسَنًا وَحُسَيْنًا فَقَالَ " اللَّهُمَّ هَؤُلاَءِ أَهْلِي " .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এখানে হাদীসটি সংক্ষিপ্ত আকারে আনা হয়েছে। অন্যান্য বর্ণনার আলোকে নিম্নে পূর্ণাঙ্গ হাদীস ও তার ব্যাখ্যা পেশ করা হলো।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন তাবুক যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হলেন, তখন হযরত আলী রাযি. কে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে মদীনায় রেখে গেলেন। আলী রাযি. বললেন, আমাকে মহিলা ও শিশুদের উপর খলীফা (ও তত্ত্বাবধায়ক) বানিয়ে যাচ্ছেন? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বললেন, তুমি কি এতে খুশী নও যে, মূসার তুলনায় যেমন হারুন ছিলেন, আমার তুলনায় তুমি তাই হবে। তবে আমার পর কোন নবী নেই।

তাবুক যুদ্ধ হুযুর (ﷺ)-এর শেষ যুদ্ধ ছিল এবং কোন কোন দিক দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল। এতে বিভিন্ন রেওয়ায়াত অনুসারে ত্রিশ হাজার সাহাবায়ে কেরামের বাহিনী হুযুর (ﷺ)-এর সাথে যেতে সক্ষম ছিলেন। যারা এ বাহিনীতে শামিল ও প্রকৃত স্বরূপ নসীব হয়নি, তারা মিথ্যা অজুহাত খাড়া করে এ বাহিনীতে শামিল হয়নি। (অবশ্য খাঁটি মু'মিনদের মধ্য থেকেও দু'চারজন এমন ছিলেন, যারা সাথে যাওয়ার নিয়ত রাখা সত্ত্বেও কোন কারণ বশত: যেতে পারেননি।) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পবিত্র স্ত্রীগণ, কন্যা হযরত ফাতেমা রাযি. ও তাঁর পুত্র কন্যাগণ এবং সেনা অভিযানে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবাদের পরিবার পরিজনকে মদীনায়ই রেখে যাওয়া হয়েছিল।

যেহেতু সফর অনেক দূর-দূরান্তের ছিল এবং অনুমান ছিল যে, ফিরতে অনেক দেরী হবে, তাই হুযুর (ﷺ) জরুরী মনে করলেন যে, এ সময়ের জন্য কাউকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে মদীনায় রেখে যাওয়া হোক- যাতে আল্লাহ না করুন- যদি কোন বাইরের অথবা আভ্যন্তরীণ ফিতনা দেখা দেয়, তাহলে তার নেতৃত্বে মদীনা থেকে যাওয়া লোকদের এবং দ্বীনের হেফাযতের ব্যবস্থা করা যায়। এর জন্য তিনি হযরত আলী রাযি.-কে বেশী উপযুক্ত মনে করলেন এবং তাঁকে হুকুম দিলেন যে, তিনি যেন তাঁর সাথে না যান; বরং মদীনায়ই থেকে যান।

বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, কলুষিত অন্তরের কিছু মুনাফিক তখন বলতে শুরু করল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত আলীকে এ কারণে তাঁর সাথে নিয়ে যাননি যে, তিনি তাঁকে এর যোগ্যই মনে করেননি। তাই কেবল নারী ও শিশুদের দেখাশুনার জন্য তাঁকে মদীনায় রেখে গিয়েছেন। হযরত আলী রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর খেদমতে হাজির হলেন এবং আরজ করলেন:

أتخلفني على الصبيان والنساء

(আপনি কি আমাকে নারী ও শিশুদের উপর খলীফা ও তত্ত্বাবধায়ক বানিয়ে যাচ্ছেন?) হুযূর (ﷺ) এর উত্তরে বললেন, 'তুমি কি এতে সন্তুষ্ট ও খুশী নও যে, তোমার মর্যাদা ও অবস্থান আমার পক্ষ থেকে তাই হবে, যেমন মূসা (আ.) এর পক্ষ থেকে হারুন (আ.)-এর মর্যাদা ও অবস্থান। তবে আমার পর কেউ নবী হবে না।'

সূরা আ'রাফের ১৪২ নং আয়াতে এ ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মূসাকে তাওরাত প্রদান করার জন্য তূর পাহাড়ে তলব করলেন, (যাতে তিনি সেখানে ইতিকাফের মত অবস্থান করেন এবং ইবাদত ও দু‘আয় লিপ্ত থাকেন-যেভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরআন নাযিলের পূর্বে হেরাগুহায় অবস্থান করেন এবং ইবাদত ও দু‘আয় লিপ্ত থাকেন) তখন মূসা (আ.) যাওয়ার সময় নিজের বড় ভাই হারুন (আ.) কে নিজের স্থলাভিষিক্ত ও খলীফা বানিয়ে আপন সম্প্রদায় বনী ইসরাঈলের সংশোধন, আত্মিক প্রতিপালন ও বিভিন্ন ফিতনা থেকে হেফাযতের জিম্মাদার বানিয়ে তাদের সাথে রেখে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে হযরত আলীকে উত্তর দিলেন যে, আমি তোমাকে আমার স্থলাভিষিক্ত ও খলীফা বানিয়ে এভাবেই মদীনায় রেখে যাচ্ছি, যেভাবে আল্লাহর নবী মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে যাওয়ার সময় নিজের অবর্তমানে কিছু সময়ের জন্য হযরত হারুনকে নিজের স্থলাভিষিক্ত ও খলীফা বানিয়ে স্বগোত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে হযরত আলীকে উত্তর দিলেন যে, আমি তোমাকে আমার নায়েব ও খলীফা বানিয়ে এভাবেই মদীনায় রেখে যাচ্ছি, যেভাবে আল্লাহর নবী মূসা (আ.) তুর পাহাড়ে যাওয়ার সময় নিজের অবর্তমানকালীন সময়ের জন্য হারুন (আ.) কে নিজের নায়েব ও আমীর বানিয়ে স্বগোত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এটা হযরত আলী রাযি.-এর জন্য বিরাট মর্যাদার কথা যে, হুযূর (ﷺ) নিজের সফরকালীন সময়ের জন্য তাঁকেই নিজের স্থলাভিষিক্ত ও খলীফা বানিয়ে মদীনায় রেখে গেলেন। আর এটা এক বাস্তবতা যে, হুযুর (ﷺ) এর সাথি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা এবং অন্যান্য কিছু কারণেও যেগুলোর বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই- এ কাজের জন্য হযরত আলী রাযি.-ই বেশী উপযোগী ছিলেন। একথাটিও স্মরণে রাখতে হবে যে, হযরত আবু বকর, হযরত উমর এবং অন্যান্য সকল বড় বড় সাহাবী এ অভিযানে হুযুর (ﷺ)-এর সহযাত্রী ছিলেন এবং তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে পরামর্শের জন্যও তাদেরকে নিজের সাথে রাখতে চেয়েছিলেন।

এখানে এ বিষয়টি উল্লেখ্য যে, শিয়া আলেম ও লেখকগণ তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)এর এ কাজ ও এ বক্তব্যকে এ কথার দলীল হিসেবে পেশ করে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খলীফা হওয়ার সবচেয়ে বেশী হকদার ছিলেন হযরত আলীই এবং হুযুর (ﷺ) তাঁকে নিজের জীবদ্দশায় খলীফা বানিয়ে পরবর্তী সময়ের জন্য খেলাফতের বিষয়টি চূড়ান্ত করে দিয়েছিলেন। একথা সুস্পষ্ট যে, এ দলীলের অসারতা ও অযৌক্তিকতা বুঝার জন্য বিশেষ পর্যায়ের কোন জ্ঞান ও বোধশক্তির প্রয়োজন নেই। সফর ইত্যাদি নির্ধারিত মেয়াদের জন্য কাউকে অস্থায়ীভাবে নিজের স্থলাভিষিক্ত করা এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পর কাউকে খলীফা ও উম্মতের নেতৃত্বের জন্য নির্বাচন করার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, এটা প্রত্যেক ব্যক্তিই সহজে বুঝতে পারে।

তারপর যদি ব্যাপারটি এমন হত যে, হযরত মুসা (আ.)-এর পর হযরত হারুন (আঃ) তাঁর খলীফা ও উম্মতের নেতা হয়েছিলেন, তাহলে এ ঘটনা এক পর্যায়ের দলীল হতে পারত। কিন্তু এ কথা সবারই জানা ও সকলের নিকট স্বীকৃত যে, হযরত হারুন (আঃ) হযরত মূসা (আ.)-এর জীবদ্দশায়ই ইতিহাসের বর্ণনানুযায়ী হযরত মূসা (আ.)-এর ইন্তিকালের চল্লিশ বছর পূর্বে ইন্তিকাল করেছিলেন এবং মূসা (আ.)-এর ওফাতের পর তাঁর খলীফা হয়েছিলেন ইউশা ইবনে নূন (আ.)।

এখানে এ বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, হুযুর (ﷺ) তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার সময় হযরত আলী রাযি. কে তো নিজের স্থানে মদীনায় আমীর, শাসক ও খলীফা বানিয়েছিলেন, কিন্তু মসজিদে নববীতে নিজের স্থানে নামাযের ইমামতির জন্য হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে নিয়োগ করেছিলেন। অথচ হযরত আলী রাযি. সর্বদিক দিয়ে তার চেয়ে উত্তম ছিলেন। আমার দৃষ্টিতে হুযুর (ﷺ) এটা এজন্য করেছিলেন যে, তাবুক যুদ্ধের সময়কালীন হযরত আলীর এ খেলাফত ও স্থলাভিষিক্ততাকে কেউ যেন হুযুর (ﷺ)-এর স্বতন্ত্র খেলাফত ও নেতৃত্বের দলীল মনে না করে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)
rabi
বর্ণনাকারী: