আল মুসনাদুস সহীহ- ইমাম মুসলিম রহঃ

১৬- হজ্ব - উমরার অধ্যায়

হাদীস নং: ৩১৪৫
আন্তর্জাতিক নং: ১৩৪২
- হজ্ব - উমরার অধ্যায়
৭১. হজ্জের সফরে বা অন্য কোন সফরের উদ্দেশ্যে যানবাহনে আরোহণকালে দুআ পড়া মুস্তাহাব এবং এর উত্তম দুআর বর্ণনা
৩১৪৫। হারুন ইবনে আব্দুল্লাহ (রাহঃ) ......... ইবনে উমর (রাযিঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোথাও সফরের উদ্দেশ্যে তাঁর উটে আরোহণের সময় তিনবার ″আল্লাহু আকবার″ (আল্লাহ মহান) বলতেন, এরপর যে দুআ পাঠ করতেন তার অর্থ এইঃ

″পবিত্র মহান সেই সত্তা- যিনি একে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের নিকট ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ! আমাদের এই সফরে আমরা তোমার নিকট কল্যাণ, তাকওয়া এবং তোমার সন্তুষ্টি বিধানকারী কাজের তৌফিক চাই। হে আল্লাহ! আমাদের এই সফর আমাদের জন্য সহজ করে দাও এবং এর দুরত্ব কমিয়ে দাও। হে আল্লাহ! তুমিই (আমাদের) সফরসঙ্গী এবং পরিবারের তত্ত্বাবধানকারী। হে আল্লাহ! তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি সফরের কষ্ট, দুঃখজনক দৃশ্য এবং ফিরে এসে সস্পদ ও পরিবারের ক্ষতিকর পরিবর্তন থেকে।″

এরপর তিনি যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন তখনও উপরোক্ত দুআ পড়তেন এবং এর সাথে যোগ করতেনঃ (অর্থ) ″আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী, আমাদের প্রতিপালকের ইবাদতকারী ও প্রশংসাকারী।″
كتاب الحج
حَدَّثَنِي هَارُونُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا حَجَّاجُ بْنُ مُحَمَّدٍ، قَالَ قَالَ ابْنُ جُرَيْجٍ أَخْبَرَنِي أَبُو الزُّبَيْرِ، أَنَّ عَلِيًّا الأَزْدِيَّ، أَخْبَرَهُ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ عَلَّمَهُمْ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا اسْتَوَى عَلَى بَعِيرِهِ خَارِجًا إِلَى سَفَرٍ كَبَّرَ ثَلاَثًا ثُمَّ قَالَ " سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الأَهْلِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِي الْمَالِ وَالأَهْلِ " . وَإِذَا رَجَعَ قَالَهُنَّ . وَزَادَ فِيهِنَّ " آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ " .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ দু'আটির প্রতিটি অংশ তার মধ্যে বিরাট ভাব ও অর্থ ধারণ করছে।

প্রথম যে কথাটি হাদীসে বলা হয়েছে, তা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ উটে আরোহণ করেই সর্বপ্রথম তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলতেন। সে যুগে বিশেষত উটের মত বাহনে আরোহণের পর আরোহীর মনে একটা অহমিকা ও আত্মম্ভরিতার ওসওয়াসা উদ্রেক হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। দর্শকের মনেও তার সম্পর্কে একটা উচ্চ ধারণা ও সমীহবোধ জেগে উঠতে পারতো। (কেননা, উট ছিল তখনকার অভিজাত বাহন ও মর্যাদার প্রতীক।) রাসূলুল্লাহ ﷺ তিনবার 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিয়ে তার উপর তিনটি কার্যকরী আঘাত করতেন। নিজের মনকে এবং দর্শকদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তারপর তিনি বলতেন:

سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ

"পবিত্র ও মহান সেই সত্তা, যিনি এ বাহনকে আমাদের জন্যে বশীভূত করে দিয়েছেন; নতুবা আমাদের সাধ্য ছিল না যে, এতবড় একটা প্রাণীকে বশীভূত করে ফেলি এবং নিজ খেয়াল-খুশি মত যেদিকে ইচ্ছে চালিয়ে নেই। এ বাক্যটির মধ্যে একথার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি রয়েছে যে, এ বাহনটিকে আমাদের বশীভূত ও নিয়ন্ত্রণাধীন করে দেয়াটা একান্তই তাঁরই দয়া ও দান। এটা আমাদের নিজেদের কোন কৃতিত্ব নয়। তারপর তিনি বলতেন:

وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ

অর্থাৎ যেভাবে আজ এ সফরে যাত্রা করছি, তেমনি একদিন এ দুনিয়া থেকেও সফর করে আমাদেরকে আমাদের মহান প্রভু পরোয়ারদিগারের পানে যাত্রা করে চলে যেতে হবে যা আমাদের আসল মকসুদ এবং চরম মঞ্জিলে মকসুদ। সে সফরটাই হবে আসল সফর এবং সে চিন্তা-ভাবনা থেকে বান্দার কখনো গাফেল বা উদাসীন থাকা উচিত নয়।
তারপর সর্বপ্রথম তিনি দু'আ করতেন:
“হে আল্লাহ! এ সফরে আমাকে তুমি এমন নেকি ও পরহেজগারীপূর্ণ আমলের তাওফীক দান করো, যা তোমার সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে।"
নিঃসন্দেহে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী মানুষের সবচাইতে বড় চাওয়া পাওয়া এটাই। এজন্যে তার সর্বপ্রথম দু'আ এটা হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তারপর তিনি সফর সহজসাধ্য ও সংক্ষিপ্ত হওয়ার দু'আ করতেন। তারপর আল্লাহর দরবারে আরয করতেনঃ

اَللّٰهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ وَالْمَالِ

“হে আল্লাহ! তুমিই সফরে আমার প্রকৃত সাথী এবং তোমার মদদ ও সাহচর্যের উপর আমার ভরসা। আর বাড়িতে যে পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদ আমি রেখে লাচ্ছি, তার দেখা-শোনা ও রক্ষার ব্যাপারেও আমি একান্তই তোমারই প্রতি নির্ভরশীল।

এসব ইতিবাচক প্রার্থনার পর তিনি সফরের ক্লেশ-কাতরতা এবং সফরে বা প্রত্যাবর্তনকালে কোন অবাঞ্ছিত দৃশ্য দর্শন থেকে আল্লাহর দরবারে পানাহ চাইতেন যার মোদ্দা কথা হচ্ছে, হে আল্লাহ! আমার এ সফরেও যেন আমি তোমার রহমত ও আনুকূল্য লাভ করি আর ফিরে এসেও যেন সবকিছু ঠিকঠাক দেখতে পাই।

হাদীসের শেষাংশে আছে, যখন বাড়িতে ফেরৎ আসার জন্যে তিনি আবার যাত্রা শুরু করতেন, তখন আল্লাহর দরবারে পুনরায় তিনি উক্ত দু'আটি করতেন। সাথে সাথে আরো বলতেন:

آئِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ

অর্থাৎ “এবার আমরা ফিরে চলেছি। নিজেদের ভুল-ভ্রান্তি-অপরাধ থেকে তওবা করছি। আমরা আমাদের মালিক ও প্রভু-পরোয়ারদিগারের ইবাদত এবং স্তব-স্তুতি করছি।" একটু ভেবে দেখুন তো, সফরের সময় সওয়ারীতে আরোহণকালেই যেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হৃদয়-মনের এ অবস্থা হতো, যা এ শব্দমালার আকারে তাঁর যবান মুবারকে জারী থাকতো, সেখানে নির্জনে নিভৃতে তাঁর অবস্থাটা কী হতে পারে।

কত ভাগ্যবান সে উম্মত, যাদের কাছে তাদের নবীর উত্তরাধিকাররূপে এমন অমূল্য রত্নভাণ্ডার সংরক্ষিত রয়েছে। আর কতই না দুর্ভাবনার কারণ সে উম্মতের ভাগ্যবিড়ম্বনা ও বঞ্চনা, যার শতকরা ৯৯ জন বা তার চাইতেও অধিক সংখ্যক লোক সে সম্পর্কে কোন খবরই রাখে না বা তা দ্বারা উপকৃত হওয়া থেকে বঞ্চিতই থাকে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)