মুফতী মাহমূদ হাসান সাহেব গাঙ্গুহী রহ.

মুফতী মাহমূদ হাসান সাহেব গাঙ্গুহী রহ.

ফকীহুল উম্মাত হযরত আকদাস মুফতী মাহমূদ হাসান ছাহেব গাঙ্গুহী রহ.


১৩২৫ হি. ১৪১৭ হি. ১৯০৭ ইং ১৯৯৬ ইং


বংশ পরিচয়

মহান আল্লাহ তাঁকে অনেক গুণে গুণান্বিত করেছেন। তিনি বংশের দিক দিয়ে আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেযবান, সাহাবীয়ে রাসূল হযরত আবূ আইউব আনসারী রাযি.-এর সাথে সম্পর্কিত।


তাঁর সম্মানিত দাদা হাজী খলীল আহমাদ ছাহেব রহ. মুহাদ্দিসুল আসর হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.-এর খাস খাদেম ছিলেন।


তাঁর মুহতারাম আব্বাজান হযরত মাওলানা হামেদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. হযরত শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদ হাসান রহ. যিনি মাল্টা দ্বীপে বন্দী ছিলেন, তাঁর বিশিষ্ট শিষ্য এবং শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা সায়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.-এর সহপাঠী ছিলেন।


বিসমিল্লাহ অনুষ্ঠান ও হিফয সম্পন্নকরণ

তাঁর বিসমিল্লাহ অনুষ্ঠান হযরত শাইখুল হিন্দ রহ. এবং হযরত মাওলানা শাহ আব্দুর রহীম ছাহেব রায়পুরী রহ. যৌথভাবে করেছেন।


গাঙ্গুহে স্বীয় খান্দানের নূরানী পরিবেশে লালিত পালিত হন।


হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. এর বুযুর্গ কন্যা, যুগের রাবেয়া বসরীর বাসায় তাঁর নিজস্ব মকতবে কুরআনে পাক হিফয সম্পন্ন করেন।


প্রাথমিক শিক্ষা

যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গ হযরত মাওলানা ফখরুদ্দীন গাঙ্গুহী রহ. যিনি হযরত মাওলানা মাযহার নানুতবী রহ. (যাঁর দিকে নিসবত করে মাদরাসায়ে মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুর নাম রাখা হয়েছে) এর বিশিষ্ট ছাত্র এবং নিজ সম্মানিত পিতা হযরত মাওলানা হামেদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. এর নিকট প্রাথমিক কিতাবাদি পাঠ করেন। পরবর্তী সময়ে মাযাহিরুল উলুমের রূহানী পরিবেশে নিজ সময়ের শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ আসাতিযায়ে কিয়ামের নিকট ইলম হাসিল করেন।


মাযাহিরুল উলূমের শিক্ষকবৃন্দ

মাযাহিরুল উলূমে তাঁর কয়েকজন উসতাযের নাম নিচে উল্লেখ করা হল।


১. মুনাযিরে ইসলাম হযরত মাওলানা আসআদুল্লাহ ছাহেব রহ.।

খলীফা হযরত হাকীমুল উম্মাত থানভী রহ., নাযেম মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুর, ইউ পি।

২. ইমামুন নাহু হযরত মাওলানা যহুরুল হক ছাহেব রহ.।

৩. হযরত মাওলানা আব্দুর রহমান ছাহেব কামেলপুরী রহ., সদর মুদাররিস মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুর, খলীফা হযরত হাকীমুল উম্মাত থানভী।

৪. ফকীহুল আসর হযরত মাওলানা মুফতী সাঈদ আহমাদ ছাহেব রহ. মুফতীয়ে আযম মাযাহিরুল উলূম, সাহারানপুর।

৫. হযরত মাওলানা আব্দুল লতীফ ছাহেব রহ. নাযেম মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুর।

৬. মুহাদ্দিসুল আসর হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া ছাহেব রহ. শাইখুল হাদীস মাযাহিরুল উলূম সাহারানপুর।


দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষকবৃন্দ

১. শাইখুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.।

২. হযরত মাওলানা মিঞা আসগার হুসাইন ছাহেব রহ.।

৩. শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা ইযায আলী ছাহেব রহ.।

৪. হযরত মাওলানা রাসূল খান ছাহেব হাজারভী রহ.।

৫. হযরাতুল আল্লাম ইবরাহীম ছাহেব বলয়াভী রহ.।

৬. হযরত মাওলানা নবী হাসান ছাহেব রহ.।


সুলুক ও মারিফাত

অতঃপর কুতুবুল ইরশাদ শাইখুল হাদীস যাকারিয়া ছাহেব রহ. এর মাধ্যমে সুলুক ও মারিফাতের মানযিলসমূহ অতিক্রম করেন এবং খেলাফত লাভে ধন্য হন। তাঁকে হযরত শাইখুল হাদীস ছাহেব রহ. এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ খলীফা হিসেবে গণ্য করা হয়।

হাকীমুল উম্মাত মুজাদ্দিদুল মিল্লাত আশরাফুল উলামা হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ., কুতুবে ওয়াক্ত হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল কাদের ছাহেব রায়পুরী রহ., তাবলীগ জামাআতের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াস ছাহেব রহ. এর ন্যায় বিশ্ববরেণ্য বুযুর্গানে দ্বীন এর সান্নিধ্য ধন্য মানুষ তিনি। রুশদ ও হেদায়েতের এ সব চাঁদ ও সূর্য থেকে তিনি যথেষ্ট উপকৃত হন। আল্লাহপ্রদত্ত যোগ্যতা বলে এ সব হযরত থেকে যাহেরী বাতেনী, বিভিন্ন গুণাবলী অর্জন করে সর্বগুণের আধারে পরিণত হন।


ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ


অর্থাৎ এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে এটা দান করেন। তিনি মহা অনুগ্রহশীল। (সূরা জুমুআহ : ৪)


ইলমী যোগ্যতা

উলুমে নকলী ও আকলী, তাফসীর ও হাদীস, ফিকহ ও ফাতাওয়া, সীরাত ও ইতিহাস, রিজালশাস্ত্র, আদব বা সাহিত্য, নাহু ও সরফ, মানতিক (যুক্তিবিদ্যা) ও ফালসাফা (দর্শন) গণিত ও জ্যামিতি, মতন ও শরাহ তথা মূল পাঠ ও ব্যাখ্যা, টীকা ও ভাষ্যগ্রন্থ, মোটকথা প্রতিটি শাস্ত্রে তাঁর ঈর্ষণীয় পাণ্ডিত্য ও অগাধ দখল ছিল। তিনি প্রতিটি শাস্ত্রে ইমাম ছিলেন। তাঁর আল্লাহপ্রদত্ত যোগ্যতা ও উপস্থিত বুদ্ধি বড় বড় আলেমকে হতবাক করে দিত। যে কোন শাস্ত্রের মাসআলা তিনি সংশ্লিষ্ট কিতাব থেকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা অনর্গল পড়ে যেতেন। আর প্রতিটি মাসআলার ব্যাপারে তাঁর এমন মযবুত ও দৃঢ় মত থাকত যে, মনে হত এর সকল দিক সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি অবগত এবং খুব গভীরতার সাথে তিনি এটাকে অর্জন করেছেন। মনে হত এটা তাঁর বিশেষ শাস্ত্র। তিনি তাঁর পুরো জীবন মনে হয় এর পিছনেই ব্যয় করেছেন।


মুফতী ছাহেবের মজলিস

তাঁর মজলিস বিভিন্ন শাস্ত্রে পারদর্শী বিদগ্ধ আলেমদের একটা বোর্ড মনে হত। একদিকে কোন মুফাসসিরে আযম কথা বলছেন তো আরেক দিকে কোন মুহাদ্দিস উপবিষ্ট। একদিকে কোন মুফতীয়ে আযম তো আরেক দিকে সীরাত-ইতিহাস ও রিজাল শাস্ত্রের ধীমান গবেষক। একদিকে কোন শাইখুল আদব আছেন তো আরেক দিকে নাহু-সরফের ইমাম মসনদে উপবিষ্ট। একদিকে মানতিক ও ফালসাফার ইমাম তো অন্যদিকে শাইখে তরীকত এবং সময়ের শ্রেষ্ঠ সাধক মানুষটি চাটাইয়ে উপবিষ্ট।


হযরতওয়ালা রহ. এর মজলিস কী ছিল? মনে হত যেন উলূম ও ফুনুনের উত্তাল তরঙ্গবিক্ষুব্ধ এক সমুদ্র যা উলুম ও ফুনুনের মণি-মুক্তা নিজ সৈকতে ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর লোকেরা কোঁচড়ে ভরে ভরে সেই সব হীরে-মোতি পান্না নিয়ে যাচ্ছে।


মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে যে ব্যক্তি যে বিষয়ে প্রশ্ন করছে সে অনুযায়ী আলেমদের এই বোর্ড উত্তর দিচ্ছে আর ইলমের রত্ন ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর এই পুরো বোর্ড মহান আল্লাহ একজন মাত্র মানুষ তথা হযরত ফকীহুল উম্মাত রহ. এর মধ্যে একত্রিত করে দিয়েছেন।


আরবী কবি বলেন:


وَلَيْسَ عَلَى اللَّهِ بِمُسْتَنْكَرِ * أَنْ يَجْمَعَ الْعَالَمَ فِي وَاحِدٍ


অর্থাৎ, মহান আল্লাহর জন্য এটা কোন ব্যাপারই নয় যে, তিনি একজন মাত্র মানুষের মধ্যে পুরো জগতকে ভরে দিবেন।


আল্লাহওয়ালা বুযুর্গানে দ্বীনের মালফুযাত ও ইরশাদাত একত্রিত করার ধারাবাহিকতা অনেক পূর্ব থেকে চলে আসছে। তাঁদের এ সব কথা ও লেখা তাঁদের মজলিস ও সান্নিধ্যের বিকল্প ব্যবস্থা হয়ে থাকে।


এগুলোর মধ্যে মানুষের দিলকে আল্লাহর ভালোবাসায় উত্তপ্ত করা, দুনিয়ার প্রতি বিতৃষ্ণা সৃষ্টি, আখেরাতের দিকে উদ্বুদ্ধ করণ এবং মহান আল্লাহর সাথে তাঁর বান্দাদেরকে সম্পৃক্ত করার আজীব ও গারীব (আশ্চর্য-অদ্ভুত) তাছীর তথা ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে।


ইন্তিকাল

১৪১৭ হিজরীর ১৮ রবীউল আখির মুতাবিক ২ ডিসেম্বর ১৯৯৬ ইং সোমবার সূর্য ডুবার পর আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় নিজ বাড়ী হতে হাজার মাইল দূরে দক্ষিণ আফ্রিকায় লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দকে শোক সমুদ্রে ভাসিয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

মহান আল্লাহ হযরত আকদাস ফকীহুল উম্মাত মুফতী ছাহেব রহ.-কে জান্নাতের আ'লা মাকাম নসীব করুন। আমীন।