
ফকীহুন নফস হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.
কুতুবুল ইরশাদ ফকীহুন নফস হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.
(১২৪৪ হিঃ ১৩২৩ হিঃ) (১৮২৯ – ১৯০৫ ইং)
জন্ম
৬ যিলকদ ১২৪৪ হিজরী মুতাবিক ১৮২৯ ঈসায়ী সোমবার গাঙ্গুহ নামক ছোট শহরে ঐ ঘরে যা শাইখুল মাশায়িখ হযরত মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস গাঙ্গুহী রহ.-এর খানকাসংলগ্ন ছিল।
নাম ও বংশ পরিচয়
রশীদ আহমাদ বিন মাওলানা হেদায়েত আহমাদ বিন কাযী পীর বখশ।
মাতা এবং পিতা উভয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেযবান হযরত আবু আইউব আনসারী রাযি.-এর বংশধর।
১২৫২ হিজরীতে যখন হযরত রহ.-এর বয়স মাত্র সাত বছর, তখন তাঁর সম্মানিত পিতা মাত্র ৩৫ বছর বয়সে গোরখপুরে ইন্তিকাল করেন। দাদা কাযী পীর বখশ হযরতকে লালন-পালন করেন।
হযরতের মামা ছিলেন চারজন
(১) মাওলানা মুহাম্মাদ নাকী ছাহেব। যিনি হযরতের শ্বশুরও। (২) মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী ছাহেব। (৩) মাওলানা আব্দুল গণী ছাহেব। (৪) মৌলবী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব। যিনি হযরত রহ. থেকে মাত্র আট বছরের বড় ছিলেন। (তালীফাতে রশীদিয়্যাহ)
ছেলেবেলার অবস্থা
হযরত ছেলেবেলা থেকেই খোদাভীরু, উদার-হৃদয়, ইবাদতগুযার, উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। জিদ, হঠকারিতা, গোড়ামিকে তিনি প্রকৃতিগতভাবেই ঘৃণা করতেন। তাঁর মধ্যে ইবাদতের শখ, আখেরাতের চিন্তার প্রতিক্রিয়া ছেলেবেলা থেকেই প্রকাশ পাচ্ছিল।
এ সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্যে তাঁর ছেলেবেলার সমস্ত অবস্থা উল্লেখ করা উদ্দেশ্য নয়। এ জন্য তাযকিরাতুর রশীদ গ্রন্থ থেকে নমুনা হিসেবে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হচ্ছে।
একটি ঘটনা
হযরত রহ.-এর বয়স তখন মাত্র সাড়ে ছয় বছর। ঐ সময় একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। একদিন তিনি বৈকালিক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ময়দানে চলে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যাকালীন শীতল বাতাসে দেহ-মন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। হযরতের বয়স যদিও কম ছিল, কিন্তু ঐ সময় থেকেই তাঁর মধ্যে ইবাদত-বন্দেগীর দারুণ স্পৃহা ছিল। এ জন্য তিনি দ্রুত কদম ফেলে ফিরে আসলেন। হাতে ফুলের দুটি তোড়া ছিল। ঘরে পৌছেই বললেন: আম্মাজান। জলদি এগুলো ধরুন, আমি নামাযের জন্য যাচ্ছি।
দ্রুত মসজিদে গিয়ে দেখলেন যে, জামা'আত দাঁড়িয়ে গেছে। উযূর জন্য গেলেন। দেখলেন যে, লোটা শূন্য। ফলে পানি উঠানোর জন্য বালতি কুয়ার মধ্যে ফেললেন। মন ছিল তাঁর নামাযে। আর হাত ছিল দড়িতে। ধ্যান ছিল জামা'আতে শরীক হওয়ার দিকে। হঠাৎ করে দড়িতে পা জড়িয়ে যাওয়ায় ধপাস করে কুয়ায় গিয়ে পড়লেন।
হযরতের মামা মুহাম্মাদ শফী ছাহেবের বর্ণনা: যেহেতু বালতি ও দড়ি তাঁর সাথেই কুয়ায় পড়ে গেছে, এ জন্য আল্লাহর কুদরত বালতিকে উল্টো করে হযরতকে তার উপর বসিয়ে দেয়। এভাবে তিনি বালতির সাথেই পানির উপর সাঁতার কাটতে থাকলেন।
যাই হোক, ফলাফল এটাই যে, মহান আল্লাহ তাঁর হিফাযত করেছেন। যখন তাঁর কুয়ায় পড়ে যাওয়ার দুর্ঘটনা ঘটে, তখন মাগরিবের নামায এক রাকাত হয়ে গিয়েছিল। সালাম ফেরানো শেষে লোকজন কুয়ার দিকে দৌড়ে গেল। হযরত রহ.-এর দাদী ছাহেবার ভাই ফয়েয আলী ছাহেব বললেন: মনে হয় রশীদ আহমাদ পড়ে গেছে। সবাই হতবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। ভেতর থেকে আওয়াজ আসল : “ঘাবড়াবেন না, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি।" যখন তাঁকে বের করা হলো, তখন জানা গেল যে, পায়ের ছোট আঙুলে হালকা চোট লেগেছে মাত্র।
এ ঘটনা দ্বারা হযরত রহ.-এর দৃঢ়তা ও অবিচলতা, বিপদে ঘাবড়ে না যাওয়া, মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ও ভরসা, ইবাদাতের জন্য কষ্ট করা এবং কোনো অভিযোগ মুখে না আনা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।
এগুলো হলো ঐসব গুণ, যা সাধারণ মানুষদের অনেক মুজাহাদা ও মেহনত করে অর্জন করতে হয়। কিন্তু এগুলো হযরতের মধ্যে তাঁর ছেলেবেলাতেই বিদ্যমান ছিল।
শিক্ষা-দীক্ষা
হযরত গাঙ্গুহী রহ. যৌবনের প্রারম্ভেই স্বীয় মেঝ মামা মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী ছাহেবের নিকট ফারসী ভাষা পড়েন। যিনি ফারসী ভাষার সর্বজন স্বীকৃত উসতায ছিলেন।
কোনো কোনো বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, তিনি ফারসীর কিছু অংশ মাওলানা মুহাম্মাদ গাউছ ছাহেবের নিকটও পড়েছেন। ফারসী থেকে ফারেগ হওয়ার পর হযরত রহ.-এর আরবী ভাষা শেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ফলে তিনি সরফ ও নাহুর প্রাথমিক কিতাবগুলো মাওলানা মুহাম্মাদ বখশ রামপুরী রহ.-এর নিকট পড়েন এবং এই উসতায থেকেই তিনি 'হিযবুল বাহর' ও 'দালায়িলুল খাইরাত' এর অনুমতি হাসিল করেন।
অতঃপর এই স্নেহশীল উসতাযের পরামর্শের উপর আমল করত: উলুমে আরবীয়্যাতে পূর্ণতা সাধনের উদ্দেশ্যে দিল্লী সফর করেন। যা তদানীন্তন সময়ে ছিল ইলম ও আদবের প্রধান কেন্দ্র।
এখানে বিভিন্ন উসতাযের দরসে তিনি উপস্থিত হন। কিন্তু কোনো স্থানেই মন বসেনি। হৃদয় পরিতৃপ্ত হয়নি।
অবশেষে উসতাযুল কূল হযরত মাওলানা মামলুক আলী ছাহেব রহ.-এর দরসে পৌঁছলে হৃদয়-মনে প্রশান্তি নেমে আসে। এটা ১২৬১ হিজরীর ঘটনা। আর এখানেই কাসিমুল উলুম ওয়াল খাইরাত হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতবী রহ.-এর সাথে তাঁর বন্ধুত্বের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। তিনিও মাওলানা মামলুক আলী ছাহেব রহ.-এর নিকট ইলম শিখতেন।
হযরত রহ. নিজ সাথী-সঙ্গী ও সতীর্থদের মধ্যে সব সময় শীর্ষে থাকতেন। আল্লাহপ্রদত্ত যোগ্যতার কারণে শিক্ষকবৃন্দ তাঁর দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতেন। কখনো সবকে অনুপস্থিত থাকলে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য স্বয়ং শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত হতেন।
আর পবিত্র হাদীস তিনি কুদওয়াতুল উলামা, যুবদাতুস সুলাহা হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল গণী মুজাদ্দিদী ছাহেব মুহাজিরে মাদানী রহ.-এর নিকট পড়েছেন।
হযরত শাহ ছাহেব রহ. অত্যন্ত উঁচু পর্যায়ের মুহাদ্দিস ছিলেন। সুনানে ইবনে মাজার টীকা 'ইনজাহুল হাজাহ' হযরত শাহ ছাহেব রহ. এরই লেখা।
প্রসিদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ
১. ফারসীতে মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী ছাহেব রহ. (সম্পর্কে আপন মামা) ও মৌলভী মুহাম্মাদ গাউছ ছাহেব রহ.।
২. আরবীতে উসতাযুল কুল হযরত মাওলানা মামলুক আলী ছাহেব রহ.।
৩. হাদীসে হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল গণী মুজাদ্দিদী ছাহেব মুহাজিরে মাদানী রহ.
বিবাহ ও পবিত্র কুরআনের হিফয
একুশ বছর বয়সে তাঁর সম্মানিত দাদাজান তাঁর বিবাহ তাঁর আপন মামাতো বোন মুহতারামা খাদীজা রহ.-এর সাথে করিয়ে দেন।
বিবাহের পরপরই এক বছরের কম সময়ের মধ্যেই নিজে নিজে কুরআনে কারীম হিফয করে ফেলেন এবং ঐ বছরই তারাবীহতেও শুনিয়ে দেন।
সন্তানাদি
১২৭৪ হিজরীর রবীউছ ছানী মাসে প্রিয় কন্যা সাফিয়্যা খাতুনের জন্ম হয়। ১২৭৮ হিজরীর জুমাদাস ছানিয়ায় প্রিয় পুত্র হাকীম মাসউদ আহমাদ জন্মগ্রহণ করেন। ১২৮৭ হিজরীর রজব মাসে মৌলভী মাহমূদ আহমাদ জন্মগ্রহণ করেন। যিনি যৌবনকালেই ইন্তিকাল করেন। (তালীফাতে রশীদিয়্যাহ)
বাইআত ও খিলাফত
সায়্যিদুত তায়িফাহ, কুতুবুল আলম হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. [ইন্তিকাল ১৩১৭ হি.] এর হাতে বাইআত হন। এরপর তো তাঁর উপরই জীবন উৎসর্গ করেন।
বাইআতের সময় দীর্ঘ অবস্থানের ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু একটানা ৪২ দিন অবস্থান হয়ে যায়। ৮ম দিন হযরত হাজী ছাহেব রহ. বললেন: "মিঞা মৌলভী রশীদ আহমাদ! আল্লাহ তা'আলা আমাকে যে নেয়ামত দিয়েছেন সেটা আমি আপনাকে দিয়ে দিলাম। আগামীতে এটাকে বাড়ানো আপনার কাজ।"
বিয়াল্লিশতম দিনে বিদায়ের সময় হযরত হাজী ছাহেব রহ. নসীহত করলেন: আপনার নিকট কেউ বাইআতের জন্য আসলে তাকে বাইআত করে নেবেন। হযরত গাঙ্গুহী রহ. আরো বলেন: আমার নিকট আবার কে দরখাস্ত করবে? হযরত হাজী ছাহেব রহ. বললেন: "যেটা বলছি সেটা করবেন"। (তালীফাতে আশরাফিয়্যাহ)
ইমামে রাব্বানী আপন শাইখের দৃষ্টিতে
মাওলানা আব্দুল মুমিন বর্ণনাকারী। একবার জনৈক ব্যক্তি হযরত হাজী ছাহেব রহ.-এর নিকট অভিযোগ করে বলল: হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. আলেম হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে সুন্দর ব্যবহার পাওয়া যায় না!! এর প্রত্যুত্তরে হযরত হাজী ছাহেব রহ. বলেছিলেন: "মিঞা। গনীমত মনে কর যে মাওলানা লোক বসতিতে থাকেন। আমার রশীদ তো মালাকূতিয়্যতের স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। যদি আল্লাহ তা'আলা তাঁর মাধ্যমে মানুষের সংশোধনের কাজ না নিতেন, তাহলে আল্লাহ জানেন যে কোন পাহাড়ের চূড়ায় বসে থাকত। ইলমী খেদমত এবং অন্য একটি বড় কাজ তাঁর থেকে নেওয়া আল্লাহ পাকের মঞ্জুর ছিল এ জন্য কোমর ধরে নিচে নামানো হয়েছে এবং লোক বসতির মধ্যে তাঁকে রাখা হয়েছে। (তালীফাতে রশীদিয়্যাহ)
এতদ্ব্যতীত যদি ঐ সব চিঠি দেখা হয় যা হযরত হাজী ছাহেব রহ. হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর নামে পাঠিয়েছেন এবং অনেক উঁচু উপাধিতে ভূষিত করেছেন। তাহলেও বোঝা যাবে যে, হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর মর্যাদা হযরত হাজী ছাহেব রহ.-এর দৃষ্টিতে কত উঁচু ছিল।
দু-একটি উদাহরণ লক্ষ করুন
১. "ফকীর ইমদাদুল্লাহ উফিয়া আনহুর পক্ষ থেকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত বরকতওয়ালা স্নেহাস্পদ মৌলভী রশীদ আহমাদ ছাহেব আম্মাত ফুয়ূযুহুম এর খেদমতে"!!
২. ফকীর ইমদাদুল্লাহ উফিয়া আনহুর পক্ষ থেকে উলূমে শরীয়ত ও তরীকতের ঝর্ণাধারা আমার স্নেহের মাওলানা রশীদ আহমাদ ছাহেব মুহাদ্দিছে গাঙ্গুহী সাল্লামাহুল্লাহু তা'আলার খিদমতে"!! (মাকাতীবে রশীদিয়্যাহ)
খলীফা ও ছাত্রবৃন্দ
এখানে মাত্র কয়েকজন খলীফা ও শিষ্যের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে। বিস্তারিত বিবরণ 'তাযকিরাতুর রশীদ' গ্রন্থে দেখা যেতে পারে।
খলীফাদের মধ্যে ৩১ জনের নাম 'তাযকিরাতুর রশীদে' লিপিবদ্ধ আছে।
১. হযরত মাওলানা খলীল আহমাদ ছাহেব সাহারানপুরী রহ.
২. হযরত মাওলানা মাহমূদ হাসান ছাহেব দেওবন্দী রহ.
৩. হযরত মাওলানা আব্দুর রহীম ছাহেব রায়পুরী রহ.
৪. হযরত মাওলানা সিদ্দীক আহমাদ ছাহেব রহ.
৫. মাওলানা মুহাম্মাদ রওশন খান ছাহেব রহ.
৬. হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ সিদ্দীক ছাহেব মুহাজিরে মাদানী রহ
৭. হযরত মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.
৮. হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইসহাক ছাহেব রহ.
৯. হযরত মাওলানা হাফেয মুহাম্মাদ সালিহ ছাহেব রহ.
১০. হযরত মাওলানা কুদরতুল্লাহ ছাহেব রহ.
ছাত্রদের মধ্যে কয়েকজনের নাম
১. মাওলানা হাকীম জামীলুদ্দীন ছাহেব নাগীনভী রহ.
২. মাওলানা হাকীম নাসীরুদ্দীন মীরাঠী রহ.
৩. মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল কারীম পাঞ্জাবী রহ.
৪. মাওলানা মুহাম্মাদ সিদ্দীক আহমাদ রহ.
৫. মাওলানা হামেদ হাসান দেওবন্দী রহ.
৬. মাওলানা মুহাম্মাদ হাসান ছাহেব মুরাদাবাদী রহ.
৭. মাওলানা সাদিকুল ইয়াকীন ছাহেব রহ.
৮. মাওলানা হাফেয আহমাদ ছাহেব রহ.
মুহতামিম দারুল উলুম দেওবন্দ
৯. মাওলানা হাবীবুর রহমান উছমানী রহ.
১০. মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া ছাহেব কান্ধলভী রহ. শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ.-এর পিতা। প্রমুখ। (তাযকিরাতুর রশীদ, তালীফাতে রশীদিয়্যাহ)
বিনয় ও নম্রতা
হযরত রহ.-এর বিনয় এত বেশি ছিল যে, সাধারণ মুসলমানদের মাধ্যমে নিজের জন্য দু'আ করাতেন এবং বলতেন: “মানুষের সুধারণার কারণে নাজাতের আশা রাখি"। "من آنم که من دانم" অর্থাৎ "আমি জানি আমি কেমন"। বেশ কিছু চিঠিতে তিনি এভাবে লিখেছেন: "আমাকে দু'আর মধ্যে অবশ্যই শামিল রাখবে আর আল্লাহ করুন যেন তোমার ধারণা অনুযায়ী আমার সাথে আল্লাহ পাকের আচরণ হয়।"
একবার মাওলানা হাকীম মুহাম্মাদ হাসান ছাহেব নিজ কলবের অবস্থার কিছু অভিযোগের কথা বললেন যে, আমার তো কোনো উপকার ও প্রতিক্রিয়া অনুভূত হয় না। মনে চায় যে, এসব ছেড়ে দিই।
হযরত রহ. তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন: "মিঞা। কাজ করতে থাক, হিম্মত হারিয়ো না। চলমান কাজ ছাড়ার কথা কে বলেছে? অনেক কিছুই হচ্ছে"।
তখন ঐ হাকীম ছাহেব আরয করলেন: “হযরত। কীভাবে আমি প্রশান্তি লাভ করব যখন আমি দেখতে পাচ্ছি কলবের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই"।
ঐ সময় হযরত রহ.-এর চোখে অশ্রু চলে আসে এবং ধরা গলায় বলেন: আল্লাহর বান্দা! তোমার নিজ মুরব্বীর কথার উপর ভরসা নেই? আমাকে দেখ না, সাধারণ মুসলমানদের সুধারণার উপর বেঁচে আছি।
মানুষ হযরতের সাথে যত বেশি সম্মান ও মহব্বতের আচরণ করত হযরতের বিনয় ও নম্রতা তত বেশি বেড়ে যেত। আর এভাবে দু'আ করতেন: “হে আল্লাহ! আমি কেমন তা তো আপনি জানেন। কিন্তু আমার সাথে মানুষের সুধারণা অনুযায়ী আপনি আচরণ করুন"।
ক্ষমার গুণ
মাওলানা সিরাজ আহমাদ ছাহেব একবার চেয়েছিলেন মৌলভী আহমাদ রেযা খানের গালিগালাজের দাঁতভাঙা জবাব দিবেন। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করার পরও হযরত এর অনুমতি দেননি। বরং বললেন: “এসবের উত্তর দিয়ে কী লাভ? শুধু সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু নয়। সে (তোমার) কথা মানবে এই আশা করা বৃথা।"
এমন পরিস্থিতিতে হযরতের কোনো কোনো খাদেম উত্তর লেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে হযরত তাদের আটকে দিয়েছেন এবং বলেছেন: "মানুষ যে পরিমাণ সময় কারো সমালোচনায় ব্যয় করে ঐ সময়টুকু যদি আল্লাহ আল্লাহ করে, তাহলে কতই না উপকার হতো"। (তাযকিরাতুর রশীদ)
গালিগালাজ ও কদর্য লেখার মাধ্যমে যে পরিমাণ কষ্ট তিনি মৌলভী আহমাদ রেযা খানের মাধ্যমে পেয়েছেন, এত কষ্ট অন্য কারো মাধ্যমে পাননি। কিন্তু আল্লাহর কসম! হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর মুখ থেকে সারাজীবনেও কখনো এমন কোনো কথা শোনা যায়নি, যার দ্বারা এটা জানা যায় যে, হযরত তাকে নিজের দুশমন মনে করেন।
ঐ সময় মৌলভী আহমাদ রেযা খানের কুষ্ঠরোগ হয়েছিল এবং রক্ত দূষিত হয়ে পড়েছিল। অনেকেই এটা ভেবে আনন্দিত হলো যে, হক্কানী উলামায়ে কেরামকে গালি দেওয়ার শাস্তি দুনিয়াতেই প্রকাশ পেয়ে গেল। কিন্তু যখন একজন হযরতের খেদমতে আরয করল যে, "বেরেলভী মৌলভী কুষ্ঠরোগী হয়ে গেছে" তখন হযরত ঘাবড়ে গেলেন এবং বললেন: "মিঞা! কারো বিপদে আনন্দিত হওয়া অনুচিত। আল্লাহ ভালো জানেন কার তাকদীরে কী লেখা আছে।"
একদিন হযরত ডাক মারফত আসা পত্রসমূহ শোনার উদ্দেশ্যে বসলেন। সর্বপ্রথম পত্র যেটা পড়া হলো, সেটা ছিল বোম্বে থেকে আসা একটি কার্ড, যাতে লেখা ছিল: “মৌলভী হেদায়েত রাসূলকে জনৈকা বিবাহিতা নারীকে বিবাহ করার অপরাধে আদালত হতে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে"। কোনো কোনো শ্রোতা এ সংবাদ শুনে খুশী হলেন, যেহেতু এ লোক হযরত রহ. এর ঘোর বিরোধী ছিল। কিন্তু হযরত রহ.-এর পবিত্র যবানে সঙ্গে সঙ্গে বের হলো: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
মারেফতের সমুদ্র
মাওলা নগরের রঈস সায়্যিদ তাহির ছাহেব কসম খেয়ে বলেন: একদিন আমি আমার মুরশিদ হযরত মাওলানা ফযলে রহমান ছাহেব গঞ্জমুরাদাবাদী রহ.-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। বুযুর্গানে দ্বীনের আলোচনা হচ্ছিল। ইত্যবসরে কোনো একজন হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.-এর হালত জিজ্ঞেস করলেন। আমার খুব মনে আছে। হযরত মাওলানা ফযলে রহমান ছাহেব রহ. বলেছিলেন : "মাওলানা রশীদ আহমাদ রহ.-এর হালত সম্পর্কে কী জিজ্ঞেস কর! উনি তো মারেফতের সমুদ্র পান করে ফেলেছেন অথচ সামান্য ঢেকুরও তোলেননি অর্থাৎ আত্মতৃপ্তিতে ভোগেননি"।
সুন্নাতের অনুসরণ ও আত্মবিলোপের বিশেষ অবস্থা
সুন্নাতে নববীর অনুসরণ এবং শরীয়তের আনুগত্য, যা হযরতের তবিয়ত বনে গিয়েছিল এরই ফলাফল ছিল যে, দশ বছর পর উপস্থিত ব্যক্তিও হযরতকে ঐ অবস্থার উপরই দেখত যে অবস্থায় দশ বছর পূর্বে দেখেছে।
শরীয়তের অনুসরণের ক্ষেত্রে এত বেশি মযবূতী ও দৃঢ়তার এটাও ফলাফল ছিল যে, তাঁর অস্তিত্ব ও তাঁর চলাফেরা ও ওঠাবসাই সুন্নাতে নববীর আশেকদের জন্য বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর ছিল।
এটাই সেই পরশ পাথর ছিল, যা দেখে বড় বড় আলেমগণ গর্দান ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষের হেদায়েত নসীব হয়েছে।
দেওবন্দের দস্তারবন্দী জলসায় আছরের নামাযের সময় মানুষের ভিড় ও মুসাফাহার আধিক্যের দরূন তাড়াহুড়া সত্ত্বেও যখন তিনি জামাআতে শরীক হলেন, তখন কিরাআত আরম্ভ হয়েছিল। সালাম ফেরানোর পর দেখা গেল যে, তাঁর উদাস চেহারায় বিষণ্ণতার গভীর ছাপ। তিনি ব্যথাভরা কণ্ঠে বলছিলেন: আফসোস! বাইশ বছর পর আজ তাকবীরে উলা ছুটে গেল! (তাযকিরাতুর রশীদ)
ইন্তিকাল
১৩২৩ হিজরীর ১২ বা ১৩ জুমাদাল উলার রাত্রে হুজরা মুবারকে নফল নামায আদায় করছিলেন। আল্লাহ তা'আলার নিকট মুনাজাতে মশগুল ছিলেন। ইত্যবসরে দুই আঙুলের মধ্যে কোনো বিষাক্ত প্রাণী দংশন করে। মুনাজাতে বিভোর থাকার ফলে সাময়িকভাবে ব্যথা অনুভূত হয়নি। কিন্তু সুবহে সাদিকের পর দুই আঙুল ও কাপড়ের মধ্যে রক্তের লাল দাগ দেখা যায়। জায়নামাযও রক্তে ভেজা ছিল। এই জখমই মৃত্যুরোগের ভূমিকা হয়ে গেছে। কষ্ট বাড়তে থাকল। এর মধ্যে তীব্র জ্বরের হামলা হলো। অবশেষে ১৩২৩ হিজরীর জুমাদাল উখরা মুতাবিক ১৯০৫ ঈসায়ী সালের ১১ আগস্ট পবিত্র জুমু'আর দিন জুমু'আর আযানের পরপরই দুপুর সাড়ে বারোটা বাজে নিজ প্রভুর সাথে গিয়ে মিলিত হন। হযরত মোট আটাত্তর বছর সাত মাস তিন দিন হায়াত পেয়েছেন।
উত্তরসূরীদের মধ্যে ছাহেবজাদা মাওলানা হাকীম মাসউদ আহমাদ ছাহেব, নাতি সাঈদ আহমাদ বিন ছাহেবযাদা মাহমূদ আহমাদ ছাহেব মরহুম এবং ছাহেবযাদী সাফিয়্যা খাতুন ছিলেন।
রূহানী সন্তানদের সংখ্যা গণনা করা অসম্ভব। যাঁরা আজ পূর্ব হতে পশ্চিমে তথা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন।
আল্লাহ তা'আলা হযরতের উপর কিয়ামত পর্যন্ত রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করুন। আমীন।
ফকীহ হিসেবে হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ.-এর অবস্থান এবং তাঁর সংকলিত ফাতাওয়ায়ে রশীদিয়্যাহ
হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ.
মুফতীয়ে আযম পাকিস্তান
হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই দারুল উলূমের শূরার সদস্য। এবং দারুল উলুমের প্রতিষ্ঠাতাদের সাথে মাদরাসার কল্যাণ ও উন্নতির কাজে তিনি সব সময় উদ্যোগী ছিলেন।
১২৯৭ হিজরীতে হযরত কাসিমুল উলূম ওয়াল খাইরাত কাসেম নানূতভী রহ.-এর ইন্তিকালের পর মাদরাসার সকল দায়িত্বশীলদের নজর হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ.-এর দিকে নিবদ্ধ হয়। এবং তাঁকেই মাদরাসার প্রধান মুরব্বী বানানো হয়।
হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর এখানে ফতোয়ার আধিক্য ছিল। আর এখান থেকেই দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ার প্রাথমিক যুগ আরম্ভহয়। আর ফিকহ-ফতোয়ার অধ্যায়ে ঐ যুগের পুরো জামা'আতের মধ্যে মহান আল্লাহ হযরত গাঙ্গুহী রহ.-কে বাছাই করে নিয়েছেন। ঐ যুগের সমস্ত উলামা মাশায়িখ ফতোয়ার ক্ষেত্রে হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর ফতোয়ার উপর আস্থা রাখতেন। আমি অধম আমার মুরশিদ হযরত হাকীমুল উম্মাত থানভী রহ.-এর নিকট থেকে নিজে শুনেছি যে, হযরত কাসেম নানুতভী রহ. হযরতওয়ালা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.-কে এ যুগের আবূ হানীফা রহ. বলে আখ্যায়িত করতেন।
আর আমার মুরশিদ হযরত হাকীমুল উম্মাত থানভী রহ.-এর দৃষ্টিভঙ্গিও হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর ফতোয়ার ব্যাপারে এমনই ছিল।
আমার উসতাযে মুহতারাম, শাইখু মাশায়িখিল আছর, দারুল উলূম দেওবন্দের সাবেক ছদরে মুদাররিস, হযরাতুল আল্লাম মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ ছাহেব কাশ্মীরী রহ. বলতেন: এখন থেকে এক শতাব্দী পূর্ব পর্যন্ত এই মানের ফকীহুন নফস উলামায়ে কেরামের জামা'আতে নজরে পড়ে না।
হযরত শাহ ছাহেব রহ.-এর পবিত্র যবানে "ফকীহুন নফস” শব্দটি পরবর্তী যুগের ফকীহদের মধ্যে হয়ত 'আল বাহরুর রায়েক'-এর লেখকের ব্যাপারে শুনেছি অথবা হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ.-এর ব্যাপারে। এমনকি আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী রহ.-এর জ্ঞান-গভীরতার স্বীকৃতি প্রদান করা সত্ত্বেও হযরত আনওয়ার শাহ ছাহেব রহ, তাঁকে "ফকীহুন নফস" বলতেন না।
যাই হোক, দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ার প্রাথমিক যুগ 'ফাতাওয়ায়ে রশীদিয়্যাহ'-এর মাধ্যমে আরম্ভ হয়। কিন্তু অত্যন্ত আফসোসের কথা যে, হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ.-এর ফতোয়ার অনুলিপি সংরক্ষণ করার কোনো ব্যবস্থাই শুরুর যুগে ছিল না। পরবর্তীতে সংক্ষিপ্ত এবং অসম্পূর্ণ কিছু ব্যবস্থা হলেও ঐ সব ফতোয়া প্রচার করার এবং হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ.-এর পুনরায় নজর বুলানোর সুযোগ হয়নি।
হযরতওয়ালা রহ.-এর ইন্তিকালের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রেরিত পত্রসমূহকে একত্রিত করে এ ফতোয়া সংকলন করা হয়েছে।
আর ইতোমধ্যে একটি সমস্যা এটাও দেখা দেয় যে, ১৩১৪ হিজরীতে (ইন্তিকালের ৯ বছর পূর্বে) হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ.-এর বাহ্যিক দৃষ্টিশক্তি অনবরত পানি পড়ার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। নিজে লেখাপড়া থেকে অপারগ হয়ে গিয়েছিলেন। ঐ সময় অধিকাংশ পত্র এবং ফতোয়ার উত্তর হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া ছাহেব কান্ধলভী রহ. (শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ.-এর আব্বা) লিখতেন। যার মধ্যে হযরত গাঙ্গুহী রহ. মাঝে মধ্যে কিছু কথা লেখাতেন। আবার কখনো বিষয়বস্তু বলে দিতেন যে, এ বিষয়ে লেখ। এ জন্য হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ.-এর ফতোয়ার যে পর্যায়ের নির্ভরযোগ্যতা হাসিল হওয়ার কথা ছিল, সেটার মধ্যে একটি বিশেষ সীমারেখা পর্যন্ত কমতি থেকে যায়।
'ফাতাওয়ায়ে রশীদিয়্যাহ' নামে যে তিন খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে কিছু কিছু মাসআলা এমনও আছে, যেগুলোর ব্যাপারে হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর খাস শাগরেদ, মুরীদ ও খলীফাগণ হযরতওয়ালার ফাতাওয়া প্রকাশিত ফতওয়ার বিপরীত বলে ব্যক্ত করে থাকেন।
এটার কারণ সম্ভবত এই যে, “ফাতাওয়ায়ে রশীদিয়া” কিতাবে যে ফাতাওয়া ছাপা হয়েছে, সেটা হয়তো হযরত রহ.-এর প্রথম জীবনের মত ছিলো। পরবর্তীতে মত পরিবর্তন হয়েছে। পরবর্তী ও চূড়ান্ত মত সেটাই, যার কথা হযরতের খেদমতে অবস্থানকারী বড় বড় আলেমগণ ব্যক্ত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ: দারুল হরবে (শত্রুকবলিত দেশ) সুদের ব্যাপারে 'ফাতাওয়ায়ে রশীদিয়্যাতে' ইমামে আযম আবূ হানীফা রহ.-এর প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী দারুল হরবে কাফেরদের থেকে সুদ নেওয়াকে নাজায়েয লিখেছেন। কিন্তু হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ.-এর একাধিক খলীফা এবং হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রহ. থেকে আমি বহুবার শুনেছি যে, হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর ফতোয়া এ ক্ষেত্রে ছাহেবাঈন (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ.) ও অধিকাংশ ইমামের মতানুযায়ী ছিল। এবং এ কারণেই হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ. হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রহ.-এর পুস্তিকা 'তাহযীরুল ইখওয়ান'-এর উপর স্বাক্ষর করেননি। কেননা, ঐ বিষয়বস্তুর ব্যাপারে হযরতের রহ. ভিন্ন মত ছিল।
এমনিভাবে سماع موتي বা মৃতব্যক্তি কবরে জীবিত মানুষের কথা শুনতে পায় কি না এ ব্যাপারে 'ফাতাওয়ায়ে রশীদিয়্যাহ'তে যে বিষয়বস্তু ছাপা হয়েছে, আমার উসতায ও মুরব্বী হযরত মাওলানা মুফতী আযীযুর রহমান ছাহেব রহ. (সাবেক প্রধান মুফতী, দারুল উলূম দেওবন্দ) হযরতওয়ালা গাঙ্গুহী রহ.-এর ফতোয়া এ মতের বিপরীত বলতেন।
আল্লাহ তাআলাই প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত।
সারকথা এটাই যে, দারুল উলূম দেওবন্দের প্রাথমিক যুগে ফতোয়ার আসল ভিত্তি হযরত গাঙ্গুহীই রহ. ছিলেন। (দ্র: ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ। করাচী মুদ্রণ, পৃষ্ঠা: ৮৫, দ্বিতীয় খণ্ড, ইমদাদুল মুফতিয়্যীন)
হযরতওয়ালা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.-এর তাফাক্কুহের ব্যাপারে হযরত মাওলানা কাসেম নানুতভী রহ.-এর সাক্ষ্য
হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রহ. বলতেন: হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতভী রহ. বলেন: “বর্তমান যুগে যদি কেউ এই কসম খায় যে, আজ আমি কোনো ফকীহকে অবশ্যই দেখব, তাহলে সে ঐ সময় পর্যন্ত স্বীয় কসম থেকে অব্যাহতি পাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহীর রহ. সাথে সাক্ষাৎ না করবে।"
হযরত নানূতভী রহ.-এর এ কথাটির উদ্দেশ্য হলো: আমাদের এই অঞ্চলে শুধু হযরত রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. 'ফকীহ' বলার উপযুক্ত। অন্য কেউ নয়। (মালফুযাতে হাকীমুল উম্মত রহ.)
কুতুবুল ইরশাদ হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ.
এর মূল্যবান অসিয়্যতসমূহ
হামদ ও সালাতের পর
এটি একটি আম (সাধারণ) অসিয়্যত। সবাই পড়বেন। অন্যকে পড়ে শোনাবেন এবং সবাই আমল করবেন।
১. নিজ সন্তানসন্ততি, স্ত্রী ও সকল বন্ধুকে গুরুত্বের সঙ্গে অসিয়্যত করছি যেন তারা শরীয়তের অনুসরণকে খুব জরুরী বিষয় মনে করে শরীয়ত অনুসারে আমল করে। দুনিয়ার বদ রসম বা কুপ্রথাসমূহের পেছনে পড়া খুবই খারাপ কাজ।
২. পানাহার ও খাদ্যের স্বাদের পেছনে লেগে থাকা দ্বীন-দুনিয়ার খারাবীর মূল। এর থেকে খুব সতর্ক থাকবে।
৩. নিজ সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কাজ করার পরিণতি হলো অপদস্থ হওয়া। দ্বীন-দুনিয়া উভয় জগতে এর খেসারত দিতে হবে।
৪. মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করা মহান আল্লাহর মারাত্মক অসন্তুষ্টির একটি উপলক্ষ। এমন মানুষ দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত হয়। আর আখেরাতেও দারুণ গঞ্জনার শিকার হবে। সকলের সাথে নরম ব্যবহার অপরিহার্য।
৫. মন্দ কাজ অল্প হলেও মন্দ। আর ভালো কাজ অল্প হলেও ভালো।
৬. লৌকিকতাপূর্ণ কাজ আনন্দ-বেদনার বিদআত থেকে মুক্ত হয় না। এর থেকে খুব সাবধান থাকবেন।
৭. মানুষ বা আত্মীয়-স্বজনের কটাক্ষ কিংবা সমালোচনার দরূন নিজ সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজ করা অথবা শরীয়ত পরিপন্থী বা বিদআতী কাজ করা নির্বুদ্ধিতা। দ্বীন-দুনিয়ায় এর পরিণতি মারাত্মক।
৮. শরীয়ত অপচয়ের মারাত্মক নিন্দা করেছে। কুরআনে কারীমে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই আখ্যায়িত করা হয়েছে।
৯. আমার ইন্তিকাল হয়ে গেলে সামর্থ্য অনুসারে ঈসালে সাওয়াব করবেন। সামর্থ্যের অতিরিক্ত কিছু একেবারেই করবেন না। শরীয়তবিরোধী কোনো লৌকিকতার আশ্রয় নেবেন না। যা কিছু হবে সুন্নাত অনুযায়ী হবে। (তাযকিরাতুর রশীদ, খণ্ড: ২, পৃ: ৩৪১)
رَحِمَهُ اللَّهُ رَحْمَةً وَاسِعَةً
الشيخ الفقيه رشيد أحمد الكنكوهي رحمه الله هوالشيخ العلامة والحبر الفهامة الإمام الرباني الفقيه المحقق المفسرالمحدث الزاهد الورع مفتي الأمة بحر العلوم بركة الأنام وعلامة الزمان شيخ مشايخ العصر ونادرة الدهرالشيخ رشيد أحمد الكنكوهي رحمه الله تعالى ، ولد الشيخ سنة 1244هـ ببلدة " كنكوه " بمديرية " سهارنفور" بالهند، وتوفي ودفن بها سنة 1323هـ . قرأ على كبار العلماء في عصره، ومن أشهرهم الشيخ مملوك علي النانوتوي (المتوفى 1267هـ) والمفتي صدر الدين آزرده (المتوفى 1285هـ) بدهلي، والحديث على الشيخ عبد الغني المجددي (المتوفى 1296هـ) حتى برع وفاق أقرانه في المعقول والمنقول، وتصدر للتدريس والإفادة ، فتهافت عليه كبار العلماء بدرسهم في الفقه، والحديث ، والتفسير، واقتصر في آخر عمره على تدريس الصحاح الستة. ولما كُفَّ بصره، ترك التدريس، وتوسع في الإرشاد، والتحقيق. أسهم إسهاماً لا يستهان به في ثورة عام 1857م ، وحارب ضد الإنجليز ، إنقاذاً للشعب الهندي والمسلمين من جحيم العبودية. ولما هدأت عاصفة الثورة ، ألقت الحكومة الإنجليزية القبض عليه، و زجّت به في السجن، إلا أنها لم تنجح في إثبات دعواها، فاضطرت إلى الإفراج عنه. واتّخذ الشيخ في السجن أسوة يوسف عليه السلام ، فاهتدى به عدد كبير من السجناء، وأنابوا إلى الله. كان شديد الغيرة على الدين، لم يكن مثله في زمانه في الصدق والعفاف، والتفقه، والشهامة ، والإقدام في المخاطر، والصلابة في الدين . وكان آية في التقوى، واتباع السنة، والعمل بالعزيمة، والاستقامة على الشريعة، و رفض البدع ومحدثات الأمور، ومحاربتها بكل طريق، والحرص على نشر السنة لا يقبل تحريفاً، ولا يتحمل منكراً، انتهت إليه الإمامة في العلم والعمل و تزكية النفوس، وإحياء السنة وإماتة البدع. (نزهة الخواطر ج8: ص163-166. ط: لكناؤ 1993م؛ تاريخ جامعة ديوبند (بالأردية) ج1- ص:125-129.) كاتب المقالة: حافظ إم خان