আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ
৫৩- বিবাহ-শাদী সম্পর্কিত অধ্যায়
হাদীস নং: ৪৮৫৭
আন্তর্জাতিক নং: ৫২৩৩
- বিবাহ-শাদী সম্পর্কিত অধ্যায়
২৭৫৫. ‘মাহরাম’ অর্থাৎ যার সাথে শাদী হারাম সে ব্যতীত অন্য কোন পুরুষের সাথে কোন নারী নির্জনে দেখা করবে না এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে কোন নারীর কাছে কোন পুরুষ গমন (হারাম)
৪৮৫৭। ‘আলী ইবনে ‘আব্দুল্লাহ (রাহঃ) ......... ইবনে ‘আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, মাহরামের উপস্থিতি ব্যতীত কোন পুরুষ কোন নারীর সাথে সাক্ষাত করবে না। এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার স্ত্রী হজ্জ করার জন্য বেরিয়ে গেছে এবং অমুক অমুক জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য আমার নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নবী (ﷺ) বললেন, ফিরে যাও এবং স্বীয় স্ত্রীর সাথে হজ্জ সমাপন কর।
كتاب النكاح
باب لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ ذُو مَحْرَمٍ، وَالدُّخُولُ عَلَى الْمُغِيبَةِ
5233 - حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، حَدَّثَنَا عَمْرٌو، عَنْ أَبِي مَعْبَدٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ» فَقَامَ رَجُلٌ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، امْرَأَتِي خَرَجَتْ حَاجَّةً، وَاكْتُتِبْتُ فِي غَزْوَةِ كَذَا وَكَذَا، قَالَ: «ارْجِعْ فَحُجَّ مَعَ امْرَأَتِكَ»
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীছে গুরুত্বপূর্ণ দু'টি বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তার একটি হলো এক পুরুষ ও এক নারীর নির্জন অবস্থান সম্পর্কিত। আর দ্বিতীয়টি হলো মাহরাম ছাড়া নারীর সফর সম্পর্কিত। প্রথমটি সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
لَا يَخْلُونَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُوْ مَحْرَمٍ (কোনও পুরুষ যেন কিছুতেই কোনও মহিলার সঙ্গে তার মাহরাম পুরুষ ছাড়া নির্জনে সাক্ষাৎ না করে)। অর্থাৎ কোনও পুরুষ কোনও নারীর সঙ্গে কিংবা কোনও নারী কোনও পুরুষের সঙ্গে এমন কোনও স্থানে একত্র হবে না, যেখানে সেই নারীর কোনও মাহরাম পুরুষ নেই। মাহরাম পুরুষ বলতে এমন পুরুষকে বোঝানো হয়, যার সঙ্গে সেই নারীর বিবাহ জায়েয নয়। যেমন পিতা পুত্র, ভাই, ভাতিজা ইত্যাদি। এ নিষেধাজ্ঞার কারণ ফিতনার আশঙ্কা। এক নারী ও এক পুরুষ নির্জন কোনও স্থানে একত্র হলে সেখানে শয়তান তাদের একজনকে অন্যজনের প্রতি আকৃষ্ট করে, যা অনুচিত কথাবার্তা থেকে শুরু করে স্পর্শ করা, এমনকি ব্যভিচার পর্যন্ত গড়াতে পারে। এজন্যই হযরত উমর ফারুক রাযি তাঁর এক ভাষণে বলেন-
أَلَا لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ.
'সাবধান! কোনও পুরুষ কোনও নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করলে অবশ্যই সেখানে তৃতীয়জন থাকে শয়তান। (জামে' তিরমিযী: ২১৬৫; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৯২১৫; সহীহ ইবন হিব্বান: ৪৫৭৬)
বাস্তবেই বিষয়টি অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই সব যুগেই মুত্তাকী-পরহেযগারগণ এ বিষয়ে সতর্ক থাকতেন। বিখ্যাত সাহাবী হযরত উবাদা ইবনুস সামিত রাযি. বৃদ্ধ বয়সে পর্যন্ত বলেছেন, যে নারী আমার জন্য হালাল নয়, তার সঙ্গে নির্জন অবস্থানকে আমি পছন্দ করি না, যদিও যা-কিছুর উপর সূর্যের আলো পড়ে তার সবই আমার হয়ে যায়। কেননা আমার আশঙ্কা শয়তান এসে প্ররোচনা দেবে।
হযরত উমর ইবন আব্দুল আযীয রহ. মায়মূন ইবন মেহরানকে উপদেশ দেন যে, সাবধান! তুমি কোনও গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করবে না, যদিও তুমি তাকে কুরআন শেখাবে বলে মনস্থ কর।
একদিকে তাদের এই কঠোর সতর্কতা, অন্যদিকে লক্ষ করে দেখুন বর্তমান সমাজের চালচিত্র। বালেগ গৃহকর্মীর সঙ্গে কেবল একা এক নারী অবস্থান করছে। হয়তো সে গৃহকর্তার স্ত্রী বা তার যুবতী মেয়ে। এ নিয়ে তার কোনও চিন্তা নেই। এমনিভাবে একা এক নারী বাড়ির গাড়িচালকের সঙ্গে কোথায় কোথায় চলে যাচ্ছে! গৃহশিক্ষক বালেগা বা উঠতি বয়সের মেয়েকে নির্জন কক্ষে পড়াচ্ছে, কি গান শেখাচ্ছে কিংবা কুরআন মাজীদই শিক্ষা দিচ্ছে। এসব নিয়ে কারও কোনও চিন্তা নেই। অথচ এ জাতীয় নির্জন অবস্থানের সুযোগে চারদিকে কত অঘটন ঘটছে। তা ঘটে যাওয়ার পর ঠিকই হুঁশ হয়। কিন্তু আগে থাকে সম্পূর্ণ বেহুঁশ। এ হাদীছ কঠোরভাবে নিষেধ করছে যেন দুই নারী-পুরুষের এরূপ নির্জন অবস্থানকে কিছুতেই প্রশ্রয় দেওয়া না হয়।
প্রকাশ থাকে যে, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা একে অন্যের মাহরাম নয়, সেরকম দুই নর-নারীর নির্জন অবস্থান অধিকতর বিপজ্জনক। তার মধ্যে আবার নারীর পক্ষে তার স্বামীর আত্মীয়স্বজন আরও বেশি ভয়ের। যেমন স্বামীর ভাই, চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই ইত্যাদি। এদের সঙ্গে সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন সর্বাপেক্ষা বেশি। অথচ বাস্তবে এদের ক্ষেত্রেই বেশি শিথিলতা করা হয়। এ শিথিলতা সামাজিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অবস্থা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনও নারী এদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে চাইলে পরিবারের লোকজনই তাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শ্বশুরবাড়ির লোকজন এটাকে ভালো চোখে দেখে না। এমনকি অনেকে এটাকে অসামাজিকতা বলে উপহাসও করে। তা যে যাই বলুক না কেন, নিজ ইজ্জত-সম্ভ্রম রক্ষার খাতিরে নারীকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। অন্যদেরও আল্লাহ তা'আলা ও আখিরাতের ভয় মাথায় রেখে তাকে সহযোগিতা করতে হবে। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে অধিকতর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। হযরত উকবা ইবন আমির রাযি. বর্ণনা করেন-
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ : يَا رَسُولَ اللهِ ، أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ؟ قَالَ: الْحَمْوُ الْمَوْتُ.
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সাবধান! তোমরা নারীদের কাছে প্রবেশ করো না। জনৈক আনসারী ব্যক্তি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি দেবর সম্পর্কে কী বলেন? তিনি বললেন, দেবর হলো মৃত্যু।' (সহীহ বুখারী: ৪৯৩৪; সহীহ মুসলিম: ২১৭২; জামে তিরমিযী: ১১৭১; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৯১৭২; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ১৭৬৫৯; সুনানে দারিমী ২৬৮৪; সহীহ ইবন হিব্বান: ৫৫৮৮; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৭৬২; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৩৫১৮)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় নিষেধাজ্ঞাটি হলো-
وَلَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ (কোনও নারী যেন মাহরাম সঙ্গী ছাড়া সফর না করে)। নারীর প্রতি এ নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়নে পুরুষকেও ভূমিকা রাখতে হবে। কাজেই কোনও নারীর যদি কোনও সফরের প্রয়োজন পড়ে, তবে তার কোনও না কোনও মাহরাম পুরুষ অবশ্যই সঙ্গে যাবে। এর জন্য সে প্রয়োজনে তার অন্যান্য ব্যস্ততা স্থগিত রাখবে বা পিছিয়ে দেবে। এমনকি সে ব্যস্ততা কোনও দীনী কাজের হলেও। জিহাদের মতো ফযীলতের কাজ আর কী আছে, বিশেষত তা যদি হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে? অথচ এক সাহাবী এরূপ মহান কাজে নাম লেখানো সত্ত্বেও যখন তার স্ত্রী হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলো, তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সাহাবীকে হুকুম করলেন-
انطَلِقْ فحُجَّ مع امرَأتِكَ (যাও, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ্জ করো)। অর্থাৎ হজ্জের মতো মহান এক ইবাদত আদায়ের জন্যও নারীকে একা যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরূপ সফরের জন্যও তার সঙ্গে তার স্বামী বা কোনও মাহরাম ব্যক্তির থাকা জরুরি। তা যদি জরুরি না হতো, তবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই আনসারী সাহাবীকে বলতেন, তুমি যখন জিহাদে নাম লিখিয়েছ, তখন জিহাদেও যাও আর তোমার স্ত্রী অন্যান্য হজ্জযাত্রীদের সঙ্গে হজ্জে যাবে। বোঝা গেল নারীর ইজ্জত-সম্ভ্রমের হেফাজত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার হেফাজতকল্পে স্বামী বা কোনও মাহরাম ব্যক্তি পাওয়া না গেলে সে হজ্জের সফর বিলম্বিত করবে, তবুও একা যাবে না।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. মাহরাম ছাড়া দুই নারী-পুরুষের নির্জন অবস্থান সম্পূর্ণ নিষেধ, সে অবস্থান যত মহৎ উদ্দেশ্যেই হোক না কেন।
খ. মাহরাম ছাড়া কোনও নারীর একাকী সফর জায়েয নয়, সে সফর হজ্জের মতো এক মহান ইবাদত আদায়ের জন্য হলেও।
গ. পুরুষের উচিত নারীর ইজ্জত-সম্ভ্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখা।
ঘ. নারীর কোনও সফরের প্রয়োজন দেখা দিলে তার স্বামী বা কোনও মাহরাম ব্যক্তি অবশ্যই তার সঙ্গী হবে, নিজের কাজ বিলম্বিত করে হলেও।
ঙ. দু'টি দীনী কাজের মধ্যে কোনও একটিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন হলে সে বিষয়ে কোনও বিজ্ঞ আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত, যেমন আনসারী সাহাবী জিহাদে যাওয়া ও হজ্জের সফরে স্ত্রীর সঙ্গী হওয়া- এ দু'টির মধ্যে কোনটাকে অগ্রাধিকার দেবেন সে বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন।
لَا يَخْلُونَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُوْ مَحْرَمٍ (কোনও পুরুষ যেন কিছুতেই কোনও মহিলার সঙ্গে তার মাহরাম পুরুষ ছাড়া নির্জনে সাক্ষাৎ না করে)। অর্থাৎ কোনও পুরুষ কোনও নারীর সঙ্গে কিংবা কোনও নারী কোনও পুরুষের সঙ্গে এমন কোনও স্থানে একত্র হবে না, যেখানে সেই নারীর কোনও মাহরাম পুরুষ নেই। মাহরাম পুরুষ বলতে এমন পুরুষকে বোঝানো হয়, যার সঙ্গে সেই নারীর বিবাহ জায়েয নয়। যেমন পিতা পুত্র, ভাই, ভাতিজা ইত্যাদি। এ নিষেধাজ্ঞার কারণ ফিতনার আশঙ্কা। এক নারী ও এক পুরুষ নির্জন কোনও স্থানে একত্র হলে সেখানে শয়তান তাদের একজনকে অন্যজনের প্রতি আকৃষ্ট করে, যা অনুচিত কথাবার্তা থেকে শুরু করে স্পর্শ করা, এমনকি ব্যভিচার পর্যন্ত গড়াতে পারে। এজন্যই হযরত উমর ফারুক রাযি তাঁর এক ভাষণে বলেন-
أَلَا لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ.
'সাবধান! কোনও পুরুষ কোনও নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করলে অবশ্যই সেখানে তৃতীয়জন থাকে শয়তান। (জামে' তিরমিযী: ২১৬৫; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৯২১৫; সহীহ ইবন হিব্বান: ৪৫৭৬)
বাস্তবেই বিষয়টি অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই সব যুগেই মুত্তাকী-পরহেযগারগণ এ বিষয়ে সতর্ক থাকতেন। বিখ্যাত সাহাবী হযরত উবাদা ইবনুস সামিত রাযি. বৃদ্ধ বয়সে পর্যন্ত বলেছেন, যে নারী আমার জন্য হালাল নয়, তার সঙ্গে নির্জন অবস্থানকে আমি পছন্দ করি না, যদিও যা-কিছুর উপর সূর্যের আলো পড়ে তার সবই আমার হয়ে যায়। কেননা আমার আশঙ্কা শয়তান এসে প্ররোচনা দেবে।
হযরত উমর ইবন আব্দুল আযীয রহ. মায়মূন ইবন মেহরানকে উপদেশ দেন যে, সাবধান! তুমি কোনও গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করবে না, যদিও তুমি তাকে কুরআন শেখাবে বলে মনস্থ কর।
একদিকে তাদের এই কঠোর সতর্কতা, অন্যদিকে লক্ষ করে দেখুন বর্তমান সমাজের চালচিত্র। বালেগ গৃহকর্মীর সঙ্গে কেবল একা এক নারী অবস্থান করছে। হয়তো সে গৃহকর্তার স্ত্রী বা তার যুবতী মেয়ে। এ নিয়ে তার কোনও চিন্তা নেই। এমনিভাবে একা এক নারী বাড়ির গাড়িচালকের সঙ্গে কোথায় কোথায় চলে যাচ্ছে! গৃহশিক্ষক বালেগা বা উঠতি বয়সের মেয়েকে নির্জন কক্ষে পড়াচ্ছে, কি গান শেখাচ্ছে কিংবা কুরআন মাজীদই শিক্ষা দিচ্ছে। এসব নিয়ে কারও কোনও চিন্তা নেই। অথচ এ জাতীয় নির্জন অবস্থানের সুযোগে চারদিকে কত অঘটন ঘটছে। তা ঘটে যাওয়ার পর ঠিকই হুঁশ হয়। কিন্তু আগে থাকে সম্পূর্ণ বেহুঁশ। এ হাদীছ কঠোরভাবে নিষেধ করছে যেন দুই নারী-পুরুষের এরূপ নির্জন অবস্থানকে কিছুতেই প্রশ্রয় দেওয়া না হয়।
প্রকাশ থাকে যে, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা একে অন্যের মাহরাম নয়, সেরকম দুই নর-নারীর নির্জন অবস্থান অধিকতর বিপজ্জনক। তার মধ্যে আবার নারীর পক্ষে তার স্বামীর আত্মীয়স্বজন আরও বেশি ভয়ের। যেমন স্বামীর ভাই, চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই ইত্যাদি। এদের সঙ্গে সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন সর্বাপেক্ষা বেশি। অথচ বাস্তবে এদের ক্ষেত্রেই বেশি শিথিলতা করা হয়। এ শিথিলতা সামাজিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অবস্থা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনও নারী এদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে চাইলে পরিবারের লোকজনই তাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শ্বশুরবাড়ির লোকজন এটাকে ভালো চোখে দেখে না। এমনকি অনেকে এটাকে অসামাজিকতা বলে উপহাসও করে। তা যে যাই বলুক না কেন, নিজ ইজ্জত-সম্ভ্রম রক্ষার খাতিরে নারীকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। অন্যদেরও আল্লাহ তা'আলা ও আখিরাতের ভয় মাথায় রেখে তাকে সহযোগিতা করতে হবে। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে অধিকতর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। হযরত উকবা ইবন আমির রাযি. বর্ণনা করেন-
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ : يَا رَسُولَ اللهِ ، أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ؟ قَالَ: الْحَمْوُ الْمَوْتُ.
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সাবধান! তোমরা নারীদের কাছে প্রবেশ করো না। জনৈক আনসারী ব্যক্তি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি দেবর সম্পর্কে কী বলেন? তিনি বললেন, দেবর হলো মৃত্যু।' (সহীহ বুখারী: ৪৯৩৪; সহীহ মুসলিম: ২১৭২; জামে তিরমিযী: ১১৭১; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৯১৭২; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ১৭৬৫৯; সুনানে দারিমী ২৬৮৪; সহীহ ইবন হিব্বান: ৫৫৮৮; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৭৬২; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৩৫১৮)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় নিষেধাজ্ঞাটি হলো-
وَلَا تُسَافِرُ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ (কোনও নারী যেন মাহরাম সঙ্গী ছাড়া সফর না করে)। নারীর প্রতি এ নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়নে পুরুষকেও ভূমিকা রাখতে হবে। কাজেই কোনও নারীর যদি কোনও সফরের প্রয়োজন পড়ে, তবে তার কোনও না কোনও মাহরাম পুরুষ অবশ্যই সঙ্গে যাবে। এর জন্য সে প্রয়োজনে তার অন্যান্য ব্যস্ততা স্থগিত রাখবে বা পিছিয়ে দেবে। এমনকি সে ব্যস্ততা কোনও দীনী কাজের হলেও। জিহাদের মতো ফযীলতের কাজ আর কী আছে, বিশেষত তা যদি হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে? অথচ এক সাহাবী এরূপ মহান কাজে নাম লেখানো সত্ত্বেও যখন তার স্ত্রী হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলো, তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সাহাবীকে হুকুম করলেন-
انطَلِقْ فحُجَّ مع امرَأتِكَ (যাও, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজ্জ করো)। অর্থাৎ হজ্জের মতো মহান এক ইবাদত আদায়ের জন্যও নারীকে একা যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরূপ সফরের জন্যও তার সঙ্গে তার স্বামী বা কোনও মাহরাম ব্যক্তির থাকা জরুরি। তা যদি জরুরি না হতো, তবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই আনসারী সাহাবীকে বলতেন, তুমি যখন জিহাদে নাম লিখিয়েছ, তখন জিহাদেও যাও আর তোমার স্ত্রী অন্যান্য হজ্জযাত্রীদের সঙ্গে হজ্জে যাবে। বোঝা গেল নারীর ইজ্জত-সম্ভ্রমের হেফাজত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার হেফাজতকল্পে স্বামী বা কোনও মাহরাম ব্যক্তি পাওয়া না গেলে সে হজ্জের সফর বিলম্বিত করবে, তবুও একা যাবে না।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. মাহরাম ছাড়া দুই নারী-পুরুষের নির্জন অবস্থান সম্পূর্ণ নিষেধ, সে অবস্থান যত মহৎ উদ্দেশ্যেই হোক না কেন।
খ. মাহরাম ছাড়া কোনও নারীর একাকী সফর জায়েয নয়, সে সফর হজ্জের মতো এক মহান ইবাদত আদায়ের জন্য হলেও।
গ. পুরুষের উচিত নারীর ইজ্জত-সম্ভ্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখা।
ঘ. নারীর কোনও সফরের প্রয়োজন দেখা দিলে তার স্বামী বা কোনও মাহরাম ব্যক্তি অবশ্যই তার সঙ্গী হবে, নিজের কাজ বিলম্বিত করে হলেও।
ঙ. দু'টি দীনী কাজের মধ্যে কোনও একটিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন হলে সে বিষয়ে কোনও বিজ্ঞ আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত, যেমন আনসারী সাহাবী জিহাদে যাওয়া ও হজ্জের সফরে স্ত্রীর সঙ্গী হওয়া- এ দু'টির মধ্যে কোনটাকে অগ্রাধিকার দেবেন সে বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)